Logo

জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ

Jamiyat Shubbane Ahl-Al Hadith Bangladesh

এই ওয়েবসাইটটি বর্তমানে উন্নয়নাধীন। সকল তথ্য খুব শীঘ্রই যুক্ত করা হবে ইনশাআল্লাহ!

রবিউল আউয়াল মাস: ঘটনাপ্রবাহ ও আমাদের শিক্ষা

রবিউল আউয়াল মাস: ঘটনাপ্রবাহ ও আমাদের শিক্ষা

إنَّ الحمد لله، نحمده ونستعينه، ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا، وسيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أنَّ محمدًا عبده ورسوله.
ভূমিকা: রবিউল আউয়াল মাসে এই উম্মতের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনা মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে, বরং এ নিয়ে অনেক মতভেদও সৃষ্টি হয়েছে। এই মাসে সংঘটিত নববী সীরাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো হলো: নবী এর জন্ম, তাঁর মদীনায় হিজরত এবং ইন্তেকাল। এসব ঘটনা শুধু মুসলমানদের জীবনে নয়, বরং জ্বিন ও মানুষের জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর এই মাসে কিছু মুসলিম এমন এক বিদআতে লিপ্ত হয়েছে যা তাদের দ্বীনে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা নবীজির জন্মকে একটি উৎসব বানিয়েছে, এর জন্য বিশেষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান নির্ধারণ করেছে, যা কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের পথের পরিপন্থী। এমনকি এদের মধ্যে কেউ কেউ নবী এর জন্মকে সীরাতের সবচেয়ে বড় ঘটনা বরং সমগ্র অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে মনে করে।
যদিও নবী এর জন্মের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো তাঁর হিজরত। আল্লাহর কৃপায় এ হিজরতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ ও মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘ শতাব্দীব্যাপী টিকে ছিল এবং মানবজাতির জন্য এক অনন্য সভ্যতা উপহার দিয়েছিল। এই ঘটনার গুরুত্বের কারণেই উমর ইবনুল খাত্তাব এবং পরবর্তী মুসলিমগণ ইসলামি ক্যালেন্ডারের সূচনা এ হিজরত থেকেই করেছিলেন।
عن الشعبي أنَّ أبا موسى رضي الله عنه كتب إلى عمر رضي الله عنه: إنّه يأتينا منك كُتب ليس لها تاريخ، فجمع عمر رضي الله عنه النَّاس، فقال بعضهم: أرِّخ بالمبعث، وبعضهم: أرِّخ بالهجرة، فقال عمر: "الهجرة فرّقت بين الحقّ والباطل فأرّخوا بها"
ইবনু আবী শাইবা ‘আমের আশশাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবু মূসা আশ‘আরী উমর -এর কাছে লিখে পাঠালেন: ‘আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে এমন কিছু চিঠি আসে যাতে কোনো তারিখ লেখা থাকে না।’ তখন উমর মানুষদের একত্রিত করলেন। কারো প্রস্তাব ছিল মাব‘আস তথা নবুয়তের সূচনা থেকে তারিখ নির্ধারণ করার, আবার কারো প্রস্তাব ছিল হিজরত থেকে নির্ধারণ করার। তখন উমর বললেন: ‘হিজরতই হলো সেই ঘটনা, যা হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য ঘটিয়েছে। তাই হিজরত থেকেই তারিখ নির্ধারণ করো।’ [আল-মুসান্নাফ ৭/২৬]
রবিউল আউয়াল মাসে নবী এর জীবনীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো তাঁর ইন্তেকাল। কারণ, নবী এর ইন্তেকাল সাধারণ মানুষের মৃত্যু নয়, এমনকি অন্য নবীদের মৃত্যুর মতোও নয়। বরং তাঁর ইন্তেকালের মাধ্যমেই নবুওয়াতের ধারা চিরতরে শেষ হয়ে যায়, আসমান থেকে খবর নাযিল হওয়া এবং আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপনও বন্ধ হয়ে যায়।
নবী মুসলিমদের উপর আসা এ মহা মুসিবতের (তাঁর ইন্তেকালের) গুরুত্বের দিকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেন:
يا أيها الناس أيما أحد من الناس أو من المؤمنين أصيب بمصيبة فليتعزَّ بمصيبته بي عن المصيبة التي تصيبه بغيري، فإن أحدًا من أمتي لن يصاب بمصيبة بعدي أشدّ عليه من مصيبتي
'হে মানুষ! মানুষের মধ্যে যে কারো বা কোনো মু’মিনের উপর যদি কোনো বিপদ আসে, তবে সে যেন আমার মৃত্যুজনিত বিপদকে স্মরণ করে তা দ্বারা সান্ত্বনা লাভ করে। কেননা আমার উম্মতের কারো উপর আমার মৃত্যুর চেয়ে বড় কোনো বিপদ আসবে না।'
(ইবনু মাজাহ-১৫৯৯; সহীহ, সহীহাহ-১১০৬)।
সিন্দী (রহ.) বলেন: 'فليتعزّ অর্থ হলো, সে যেন নিজের উপর আসা কষ্টকে হালকা করে নেয় এ মহা বিপদকে স্মরণ করার মাধ্যমে। কারণ ছোট বিপদগুলো বড় বিপদের সামনে তুচ্ছ হয়ে যায়। তাই যখন মানুষ বড় বিপদের উপর ধৈর্য ধারণ করতে পারে, তখন ছোট বিপদ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়।' (হাশিয়াতুস সিন্দী ‘আলা ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৫৯৯)।
সৎকর্ম ও তাকওয়ার উপর সহযোগিতা করা, সত্যের উপর একে অপরকে উপদেশ দেওয়া এবং ধৈর্যের উপর উৎসাহিত করার জন্য নসিহত, দিকনির্দেশনা ও উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে আমি (লেখক) তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি তামীম আদ-দারী থেকে বর্ণিত সেই হাদীসকে, যেখানে নবী (সা.) বলেছেন:
الدِّين النَّصيحة، قلنا: لمن؟ قال: لله، ولكتابه، ولرسوله، ولائمة المسلمين وعامتهم
'দ্বীন হলো নসিহত।' আমরা জিজ্ঞাসা করলাম: কার জন্য? তিনি বললেন: 'আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিমদের নেতাদের জন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য।' (মুসলিম- ৫৫)।
এই হাদীস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি রবিউল আউয়াল মাস সম্পর্কে এ ছোট্ট রিসালাহ (পত্র) সংগ্রহ করেছি। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এটিকে উপকারী করেন, এবং এটি যেন তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খাঁটি ও সঠিক হয়; অর্থাৎ, যেন তা নবী (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী হয়।
রবিউল আউয়াল এর অর্থ ও নামকরণের কারণ:
প্রথমত:
রবিউল আউয়াল এর অর্থ:
এ মাসকে রবিউল আউয়াল বলা হয়েছে, কারণ এর নামকরণ বসন্ত ঋতুতে (আরবীতে রবী) করা হয়েছিল, আর সেই নামই থেকে গেছে।
রিব্’ অর্থ হলো: কারো বসতি বা স্থায়ী বসবাসের স্থান। যেমন বলা হয়: ما أوسع ربع بني فلان! অর্থাৎ, অমুক গোত্রের বসতি কতই না বিস্তৃত!
আরবীতে বলা হয়: ربعت الإبل অর্থাৎ, উট যখন কোনো বসতিতে এসে থামে ও অবস্থান করে। একইভাবে বলা হয়: جاءت الإبل روابع অর্থাৎ, উটেরা বসতিতে এসে অবস্থান করল।
ইবনুস সিকীত বলেন: ربع الرجل يربع অর্থ, মানুষ যখন কোথাও থামে ও অবস্থান করে।
আরবদের নিকট ‘রবী’ (বসন্ত) দুই প্রকার:
১. রবীউল-শুহুর (মাসের বসন্ত):
এটি সফর মাসের পরের দুই মাস। আর এর জন্য শুধু এভাবেই বলা হয়: শাহরু রবীউল আউয়াল (রবিউল আউয়াল মাস) এবং শাহরু রবীউল আখির (রবিউল আখির মাস)।
২. রবীউল-আজমিনা (সময়ের বসন্ত):
এটিও দুই প্রকার:
১. (الرَّبيع الأول): যে ঋতুতে কামা (এক প্রকার উদ্ভিদ) ও ফুল জন্মে, যাকে বলা হয় রবীউল-কালা (চারার বসন্ত)।
২. (الرَّبيع الثاني): যে ঋতুতে ফলমূল পাকে। কিছু লোক এটিকেই প্রথম বসন্ত বলে থাকে।
রবী’ (ربيع)-এর বহুবচন:
আরবীতে রবী এর বহুবচন হলো أربعاء (আরবিআ) এবং أربعة (আরবাʿআহ) যেমন نصيب (নসীব)-এর বহুবচন أنصباء (আনসবাআ) ও أنصبة (আনসিবাহ)।
ইয়াকুব (রহ.) বলেন: رَبيعُ الكَلَإ (ঘাস-চারার বসন্ত)- এর বহুবচন হয় أربعة (আরবাʿাহ) এবং رَبيعُ الجَدَاوِل (খালের বসন্ত)-এর বহুবচন হয় أربعاء (আরবিআ)।
আর ‘রবী’ শব্দের আরেক অর্থ হলো: বসন্তকালের বৃষ্টি। এর থেকে বলা হয়: رَبَعَت الأرض فهي مربوعة অর্থাৎ, জমিতে বসন্তের বৃষ্টি হয়েছে, ফলে তা সতেজ হয়ে উঠেছে।
الصحيح في اللغة ১/২৩৮، المصباح المنير ১/২১৬، المفصل في تاريخ العرب ১৫/২৭৫
দ্বিতীয়ত: নামকরণ (تسميته):
রবিউল আউয়াল মাসকে এ নামে ডাকার পেছনে কয়েকটি বর্ণনা এসেছে। তার মধ্যে একটি হলো আরবরা সফর মাসে অন্য গোত্রে হামলা করে যা লুটতরাজ করত, সেটাকে তারা এ মাসে (রবিউল আউয়াল) ভাগাভাগি করে নিত। কারণ সফর ছিল তাদের কাছে আক্রমণ শুরু করার প্রথম মাস, যা মুহাররম মাস শেষ হওয়ার পর থেকে শুরু হতো। তবে এটি ছিল জাহেলিয়াতের আমল। ইসলাম আগমনের পর এ ধরনের জাহেলি ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে, এবং রক্তক্ষয় বন্ধ করা হয়েছে; শুধুমাত্র শরীয়তের বিধান যেমন কিসাস ইত্যাদির প্রয়োজনে হত্যা করা বৈধ রাখা হয়েছে।
কিছু মানুষ বলেছেন, এই মাসের নামকরণ এমনও হয়েছে কারণ এই মাস ও এর পরের মাস (রবিউল আখির) উভয়েই মানুষের এবং গবাদিপশুর জন্য আরামদায়ক ও শীতল সময় হিসেবে পরিচিত ছিল। এই দুই মাস আসে এমন একটি সময়ে যা আরবরা খরিফ বলে ডাকে, এবং তারা এটিকে রবিউ বলত। আরবদের কাছে রবিউ বলতে মূলত গ্রীষ্মের শীতল সময় বোঝাত, আর গ্রীষ্ম বলতে মূলত তপ্ত সময় বোঝাত।
আরেকটি মত হলো আরবরা শীতকে দুই ভাগে ভাগ করত। প্রথম ভাগকে তারা বলত রবিউয়ুল মা‘ ওয়াল মাতার তথা পানি ও বৃষ্টির বসন্ত, দ্বিতীয় ভাগকে বলত রবিউয়ুল কালা তথা উদ্ভিদের বসন্ত, কারণ এই সময়ে উদ্ভিদ পূর্ণতা পেত। আসলে, আরবদের কাছে পুরো শীতই ছিল এক ধরনের রবিউ কারণ এতে ভেজা ও শিশির বেশি থাকে।
বাস্তবে, আরবদের কাছে রবি ছিল দুই রকম:
১. রবীউল-শুহুর (মাসের বসন্ত) যা সফরের পরবর্তী দুই মাস: রবিউল আউয়াল ও রবিউল আখির।
২. রবীউল-আজমিনা (সময়ের বসন্ত) যা আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
রবিউল আউয়াল: যে ঋতুতে কামা (এক প্রকার উদ্ভিদ) ও ফুল জন্মে। আরবরা এটিকে বলত রবিউ আল-কালা অর্থাৎ পশুপশির খাবারের জন্য অনুকূল সময়।
রবিউস সানী: এটি সেই সময়, যখন ফল সংগ্রহযোগ্য হয়, কেউ কেউ এটিকে রবিউল আখির বলে, আবার কেউ কেউ আগের মতো এটিকেও রবিউল আউয়াল বলে উল্লেখ করে।
এইভাবে, আবু আল-গাউস বলতেন:
"আরবরা বছরকে ছয়টি ভাগে ভাগ করত: দুই মাস এর মধ্যে ছিল রবিউল আউয়াল, দুই মাস গ্রীষ্ম, দুই মাস তপ্ত গরম (قيظ), দুই মাস রবিউস সানী, দুই মাস শরৎ এবং দুই মাস শীত।"
[আল-কামুসল মুহীত, পৃষ্ঠা ৯২৮; তাজ আল-‘আরূস ২১/৩৪; লিসানুল আরব ৮/৯৯]


📥 বাকি অংশ পড়তে PDF ডাউনলোড করুন