“من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله، ومن يطع الأمير فقد أطاعني، ومن يعص الأمير فقد عصاني “ متفق عليه
অনুবাদঃ
রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহরই অবাধ্যতা করল। অনুরূপভাবে যে আমীরের অনুগতা করল সে আমারই আনুগত্য করল। আর যে আমীরের অবাধ্যতা করল সে আমারই অবাধ্যতা করল” (বুখারী ও মুসলিম)
ব্যাখ্যাঃ
ছোট এই হাদীসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষিতে এটি আরও তাৎপর্য বহন করছে। মূলতঃ হাদীসটিতে ইসলামী নেতৃত্বের মর্যাদা ও ধরন বর্ণিত হয়েছে। এক কথায় বলা যায় ‘আমীর’ এর স্বরূপ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া হয়েছে। আজকের দারসুল হাদীসে আমীর ও ইমারত সম্পর্কেই আলোচনা উপস্থাপিত হবে ইনশা আল্লাহ। ইমারত দু’প্রকারের যথা: (১) রাষ্ট্রীয় ইমারত (২) বিকল্প ইমারত। নিয়ে এতদসংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপিত হলোঃ
(১) রাষ্ট্রীয় ইমারত।
ইমরাত অর্থ রাষ্ট্র ও আমীর বলতে রাষ্ট্রপ্রধানকে বুঝায়। ইমারত শব্দের যারা সাধারণত ইসলামী রাষ্ট্র বুঝায় ও আমীর বলতে মুসলিম শাসককে বুঝায়। তবে ইসলামী রাষ্ট্র বলতে আমরা যে প্রচলিত বর্তমান। রাষ্ট্র বুঝি সেটি নয়। কারণ ঐ সব রাষ্ট্রগুলিকে ইসলামী রাষ্ট্র এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলি যে দেশের নাগরিক অধিকাংশ বা সকলেই ইসলামের দাবীদার বা মুসলমান অথবা শাসক-জনগণ সকলেই ইসলামের দাবীদার। কিন্তু আসলে ইসলামী রাষ্ট্র বলতে ঐ রাষ্ট্রকে বুঝায় যে রাষ্ট্রের শাসক মুসলিম ও র নাগরিকের উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের বিধিবিধান প্রযোজ্য, এতে জনগণের অধিকাংশ অমুসলিমই থাকুক না কেন। উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম ইমারত ও আমীরের স্বত্তপ দু’ধরনেরঃ একটি হল, আমীর নিজের জীবনে ও তাঁর রাষ্ট্রে ইসলামী আইন পূর্ণাঙ্গরূপে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করেন। এমন আমীর ও তার রাষ্ট্রের বা ইমারতের প্রতি প্রতিটি নাগরিকের আনুগত্য বা বশ্যতা স্বীকার ও সর্ব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও আমীরকে সর্ব প্রকারের সহযোগিতা করা ওয়াজিব এবং আমীর বা ইমারতের প্রতি কোন প্রকার অবজ্ঞা, অসম্মান, অসহযোগিতামূলক ভাব দেখানো বা আমীরের মধ্যে সামান্য দুর্বলতা বা ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়া মাত্র সমালোচনায় ফেটে পড়া বা বিদ্রোহ ঘোষণা করা বা তার বিরুদ্ধে দল গঠন করা বা জন সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা ইত্যাদি সকল প্রকারের কর্মকার শরী’য়তে সম্পূর্ণভাবে হারাম ও ইসলাম বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ন্যায়পরায়ণ ও নিষ্ঠাবান একজন আমীরের আনুগত্য করার মধ্যেই নবী (সা:) এর প্রতি আনুগত্য নিহিত।
উপরোক্ত হাদীসটির দ্বারা একথা পরিষ্কার যে, এই আনুগত্যের ধারা ব্যক্তি থেকে আমীর, আমীর থেকে নবী (সা:) আর নবী (সা:) থেকে আল্লাহ এই ধারার মধ্যে কেউ ব্যতিক্রম করলে বা ধারার অংশ বিশেষ বাদ দিলে তার জীবন কখনই ইসলামী জীবন হিসাবে পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না এবং তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। ঐ বাক্তি যতই যোগ্যতাসম্পন্ন বা সুনাম সুখ্যাতি ধন্য এবং ব্যক্তিগত ভাবে যতই খোদাভীরু পরহেজগার হন না কেন।
এ ব্যাপারে অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেছেন।
من كره من اميره شيئا فليصير فانه من خرج من السلطان شيرا مات ميتة جاهلية - متفق عليه
“তোমাদের কেউ যদি তার আমীরের মধ্যে কোন অপছন্দনীয় কিছু লক্ষ্য করে তাহলে সে যেন ধৈর্য্য ধারণ করে, কারণ যে ব্যক্তি ইমারত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেল তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু” (বুখারী ও মুসলিম)।
দ্বিতীয় রাষ্ট্রের ধরন বা রূপ হলো রাষ্ট্রের জনগণ অধিকাংশ বা সকলেই মুসলমান। রাষ্ট্র প্রধানও ইসলামের দাবীদার তথা ক্ষেত্র বিশেষে তার জীবনে কিছু কিছু ইসলামী অনুশাসন পালনের দৃষ্টান্ত ও পাওয়া যায় যেমন হজ্জ, উমরা, ঈদের নামায ইত্যাদি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আইন কানুনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই বরং অনেক ক্ষেত্রে তার বিপরীত অবস্থাই দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি জনগণ যদি স্বউদ্যোগে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতিকে নিজ ব্যক্তি জীবনের বাইরে সামাজিক জীবনে যথাযথভাবে রূপ দেওয়ার সামান্যতম চেষ্টাও চালায় তাহলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কারের বদলে তিরস্কার করা হয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে এ চিত্রই দেখা যায়। আবার কোন কোনটির অবস্থা আরও শোচনীয়, যেখানে ব্যক্তিগত ভাবে দীন পালন করলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন অতি সম্প্রতি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মুসলিম নামধারী রাষ্ট্র তুরস্কে, যেখানে সর্বোচ্চ আদালত একজন মহিলা সংসদ সদস্যার (যার নাম মার্তিকাবারসি) বিরুদ্ধে মাথায় হেজাব পরার কারণে শান্তির নির্দেশ দিয়েছে। অথচ তিনি এ হেজাবের পক্ষে প্রচারণায়ও নামেননি বা উড়না বাধ্যতামূলক করার জন্য মুসলিম নামধারী তাগুত সরকারের নিকট দাবীও জানাননি বরং তা ছিল একেবারে ব্যক্তিগত পছন্দ ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলামের সমান্যতম একটি আচারকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বাস্তবায়িত করায় তাঁকে হারাতে হয়েছে তাঁর মূল্যবান নাগরিকত্বকে। অথচ তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারা কিংবা নারী স্বাধীনতার মতলবী প্রচারকগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে। এভাবেই চলছে আরও অনেক নামধারী মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের অবমূল্যায়ন। আমাদের দেশেও এর অনেক উদাহরণ আছে। এ সকল নামধারী মুসলিম রাষ্ট্রে জাহেলী আরবের শাসনের চেয়েও জঘন্য অবস্থা বিরাজমান, কারণ যেখানে ঘরের ভিতরে বা নির্জন গুহায় বা ব্যক্তিগত জীবনে সকল ধর্মের বিধিবিধানকে মান্য করার পথে কোন বাধা বা শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না।
(২) বিকল্প ইমারত।
এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, বিশ্বের শুরু লগ্ন থেকে দুইটি শক্তির মধ্যে প্রত্যক্ষ সংঘাত চলে আসছে-তাহলো ডান শক্তি ও বাম শক্তি অর্থাৎ এলাহী শক্তি ও শয়তানী শক্তি। এই দুই শক্তির সমর্থকেরা সর্বদা চেষ্টায় লিপ্ত থাকে স্ব স্ব পক্ষের ক্ষমতা সঞ্চয় বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীদের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে শয়তানী রায়কে প্রতিহত করা ও দীনে এলাহী প্রতিষ্ঠা করা। আবার শয়তানী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠাকারীদের চেষ্টা তার সম্পূর্ণ উল্টোটি। অর্থাৎ আল্লাহর দীনকে প্রতিহত করা ও শয়তানী কাজের।
তাই শয়তানী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীরা প্রকৃত শয়তান হোক ও মানবরণী শয়তান হোক আল্লাহর ভাষায় সকলেই শয়তান হিসাবে গণ্য হবে এবং শয়তান ও শয়তানী শক্তির মূলোৎপাটনের জন্য তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণাসহ যাবতীয় কৌশল অবলঙ্কন করা একজন মু’মিনের ধর্মীয় দায়িত্ব। আর এ মিশনে সফলকাম হওয়ার জন্য প্রয়োজন যোগাতার, প্রয়োজন শক্তির, প্রয়োজন একতার আর এ সবকিছু অর্জন করতে হলে তার পূর্বশর্ত একটি সংগঠন ও সংগঠকের। অর্থাৎ একজন আমীর ও ইমারতের অস্তিত্বের। এ ইমারতকেই বলা হয় বিকল্প ইমারত বা অভ্যন্তরীণ ইমারত। আর এ ইমারত সম্পূর্ণভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ও অত্যন্ত জরুরী। তা না হলে মানুষের ঘাড়ে চেপে বসা শয়তানী তাগুতী শক্তির উচ্ছেদ সাধন অথবা দুর্বল করে দিয়ে আল্লাহর কানুন বাস্তবায়নের পথ প্রসস্থ করা যাবে না বা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। না। অথচ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
کنتم خیر امة اخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر آل-عمران – ۱۱۰
অর্থাৎ তোমরাই হলে সার্বাত্তম উম্মত মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের জন্য নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। মহান আল্লাহ আরও বলেছেনঃ
فقاتلوا أولياء الشيطان أن كبد الشيطان كان ضعيفا النساء ٧٦
অর্থাৎ তোমরা জিহাদ করতে থাক শয়তানের পক্ষালম্বীদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল
রামুনুল্লাহ (সা:) এ বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে এরশাদ ফরমিয়েছেন।
من رأى منكم منكرا فليغيره بيده فان لم يستطع فبلسانه فان لم . يستطع فبقلبه وذلك أضعف الايمان – رواه مسلم
অর্থাৎ তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে তাহলে তা শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করবে আর যদি শক্তি প্রয়োগে অক্ষম হয় তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিবাদ করবে তারও যদি ক্ষমতা না থাকে আহলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এর পরে ঈমানের স্তর বা বাস্তবতা নেই (মুসলিম)।
উপরোল্লখিত আয়াত ও হাদীসে সাধারণভাবে সকল মুসলমানকে সব ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ও সৎ কাজের প্রতি আহবান করার কথা বলা হয়েছে। এতে অন্যায়কারী শাসক হোক আর শাসিতই হোক, ধনী হোক আর গরীব হোক, কৃতদাস হোক আর স্বাধীন হোক সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সংক্ষিপ্ত হলেও এ আলোচনায় মোটামুটি স্পষ্ট যে রাষ্ট্র ইসলামী না হলে এর সীমারেখার ভিতরে কোন গোষ্ঠী বা সহীহ আকীদাভুক্ত কোন সম্প্রদায়কে নিয়ে অল্লাহর জমীনে তাঁর আইন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অপরিহার্য দায়িত্ব আদায়ের নিমিত্ত্বে একজন সৎ নিষ্ঠাবান নেতা তথা আমীরের অধীনে, ইমারত বা জমঈয়ত প্রতিষ্ঠা করা ওয়াজিব ও আল্লাহর দলভূক্ত সকল মু’মিনাকে এ আমীরের অধীনে থেকে তাঁর ও তাঁর সংগঠন বা ইমারতের প্রতি সর্বপ্রকার সহযোগিতা ও আনুগতা প্রদর্শন করত। তাঁর উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য সার্বিক কাজে অংশীদার হওয়া ফরজ ও জরুরূ। কোন প্রকার বিরুদ্ধাচরণ কতায়, কাজে বা আচরণে প্রকাশ পেলে তার ঈমানের দাবি মিথ্যায় পর্যবেশিত হবে, তিনি যতই আল্লাহ ভীরুতা এবং পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করুন না কেন। কারণ সত্যের মাপকাটি ব্যক্তি সুখ্যাতি বা পারিতা নয়- মাপকাঠী হচ্ছে আল-কুরআন ও আল হাদীস। তাই আসুন আমরা সকলেই কি করেছি, কি করছি তা না। তেবে কি করব বা আমাদের কি করণীয় সেদিকে দৃষ্টি ফিরাই। আমাদের সকল ভেদাভেদ ও ব্যক্তি স্বার্থ পরিহার করে দীনের স্বার্থ ও পরপারের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আবার ফিরে যাই আমাদের হারানো ঠিকানায়- আমাদের একমাত্র ইমারত জমঈয়তে আহলে হাদীদের ছায়াতলে। যাতে করে আমাদের দ্বারা বিভ্রান্ত না হয় আমাদের অবিষ্যৎ প্রজন্ম, রহিত না হয় আমাদের অগ্রযাত্রার ধারবাহিকতা এবং আমাদেরকে দাঁড়াতে না হয় শেষ দিনে আল্লাহ, রাসুল (সা) ও ডু’মিনদের সামনে জবাবদিহিতার জন্য। তাই সময় থাকতে আসুন আমরা সকলে ভাই ভাই হয়ে যাই, বাস্তবায়ন করি নবী (সা) এর রেখে
ولا تجسسوا ولا تحاسدوا ولا تباغضوا ولا تدابروا وكونوا عباد الله اخوانا
অর্থাৎ তোমরা পরস্পরের ছিদ্র অন্নেষণ করোনা, হিংসা করো না, বিদ্বেষ করো না, চক্রান্ত করো না, কোমরা আল্লাহর বান্দা হিসাবে সঙ্গণে ভাই ভাই হয়ে যাও (বুখারী ও মুসলিম)।
وصلى الله على سيدنا محمد واله وصحبه وسلم .




