মুঘল সম্রাটদের শাসনকার্য হিজরী সন অনুযায়ী পরিচালিত হতো। এতে করে খাজনা আদায়ে অসুবিধা দেখা দিত। সমস্যার কারণ ছিল চান্দ্রবর্ষ প্রতিবছর ১০/১২ দিন এগিয়ে যায়। ফলে ফসল ওঠা ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর সৌর বর্ষের হিসাবে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।
সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহন করেন ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে। হিজরী সাল অনুযায়ী ৯৬৩ সালের মুহাররম মাসে। সেই সময়ে বাংলায় শকাব্দ চালু ছিল। যার শুরুর মাস ছিল চৈত্র। উল্লেখ্য যে, শকাব্দ হলো এশিয়ার প্রাচীন রাজা শক কর্তৃক প্রবর্তিত সাল।
সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণের মাস ছিল মুহাররম। মুহাররম মাস ও শকাব্দের বৈশাখ মাস উভয় মাস একসাথে মিলে যাওয়ায় তিনি প্রথম সন হিসাব শুরু করেন বৈশাখ মাস দিয়ে। ঠিক তখন থেকে চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাস দিয়ে শুরু হয় বাংলা নববর্ষ।
পহেলা বৈশাখ ও সংস্কৃতির অনিয়ন্ত্রণশীলতা :
পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ। যা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।
প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের এ পহেলা বৈশাখ ১৪ই এপ্রিল খুবই গাম্ভীর্যের সাথে উদযাপন করে এদেশের সংস্কৃতিমনা কথিত সুশীল, বুদ্ধিজীবী ও হাজারো তরুণ-তরুণী। সম্রাট আকবর এ সংস্কৃতিকে উদ্ভাবন করেছেন মূলত একটি সামগ্রিক অর্থে সকল ধর্মের অংশগ্রহণে উৎসব পালনে যৌগিক উৎসব। যেখানে তার মতবাদ তথা রচিত ‘দ্বীনে ইলাহী’ সকল ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। পহেলা বৈশাখ এ সংস্কৃতি উদ্ভাবনে তিনি মূলতঃ হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার সমাবেশ করেছেন। আসলেই বাস্তবিক অর্থে পহেলা বৈশাখ এটা কোন মুসলিমের সংস্কৃতি নয় বরং নিঃসন্দেহে এটা হিন্দুদের সংস্কৃতি।
বর্তমানে প্রচলিত পহেলা বৈশাখ :
বর্তমানে প্রচলিত পহেলা বৈশাখে যে সকল কর্মকাণ্ড করা হয় তা অতীত ইতিহাসে বাঙালি মুসলিমেরা কখনও করেনি এবং এ ধরনের নোংরা কর্মকাণ্ড কখনও ভুল করে চিন্তাও করেনি। কেননা বর্তমানে প্রচলিত পহেলা বৈশাখ ইসলামী মূল্যবোধের সাথে চরম সাংঘর্ষিক। যে উৎসবের মাধ্যমে ইসলামী আকীদা, আচার অনুষ্ঠানকে অবমাননা করা হয়। সেইসাথে এ আয়োজনে তরুণ-তরুণী যুবক-যুবতীদের মধ্যে ব্যাপক অশ্লীলতা, বেহায়াপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অথচ আমরা মুসলিম। আমাদের সামগ্রিক জীবনে যত উৎসব, আয়োজন পালন করি না কেন সকল কিছুর পিছনে আগে দেখতে হবে এটা আদৌও শরীয়ত অনুমোদিত কি-না? সেক্ষেত্রে পহেলা বৈশাখ এর বাইরে নয়।
পহেলা বৈশাখে ইসলামবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড :
শয়তান মানব জাতির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য চরম শত্রু। শয়তান বিশেষত মুসলিমদের সঠিক পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য বিভিন্ন শয়তানী নীলনকশা তৈরি করে। যাতে করে মুসলিম তার পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টা নষ্ট করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিঃসন্দেহে শয়তানের নীলনকশার এক পাতানো ফাঁদ। এ উৎসবে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, আবাল-বণিতা বর্ষ বরণের নামে যেসব কাজ করে তা কোনোদিন ইসলাম সমর্থন করে না, করবেও না। তথাকথিত এ আবহমান কালে বাঙালি সংস্কৃতি বলে কথা!! এ পহেলা বৈশাখে তারা আয়োজন করে- বৈশাখী মেলা, যাত্রা, পালা গান, কবি গান, জারি গান ছাড়াও বিভিন্ন প্রদর্শনী অনুষ্ঠান, লোক সঙ্গীত, প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানো, বিভিন্ন মূর্তির প্রদর্শন, বিভিন্ন রকমের শাড়ী পরে অর্ধনগ্ন সৌন্দর্য প্রদর্শন, পান্তা ইলিশ খাওয়ার নামে ধনী শ্রেণীর লোকদের সাথে ঠাট্টার প্রহসন! চারু-শিল্পীদের রাক্ষস, পেঁচা সেজে শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে রবী ঠাকুরের গানের সাথে তরুণ-তরুণীর ঠেঁাট মিলিয়ে গান উদযাপনসহ অসংখ্য নোংরা, ঘৃণিত, অশ্লীলতা, শির্ক, কুফরী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হয় এ পহেলা বৈশাখের নামে তথাকথিত অনুষ্ঠানে। যা একজন রুচিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অংশগ্রহণ করা কখনও সমীচীন নয়। একজন মুসলিম তো অংশগ্রহণ করতেই পারে না। বিবেকের তাড়নায় এবং রুচিশীলতার কারণে একজন অমুসলিমও এই উৎসবে অংশগ্রহণ করা ভীষণ আপত্তিকর ও রুচির পরিচায়ক।
মঙ্গল শোভাযাত্রা; আবহমান কালের সংস্কৃতি?
বাংলাদেশের বাঙালি তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিমনা পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বর্তমানে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে অন্তভুর্ক্ত করে জোরালোভাবে উদযাপন করছে। যেন এ মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়া পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা অকল্পনীয়। অথচ এ হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে পহেলা বৈশাখে উৎসবে তারা জোর করে অন্তভুর্ক্ত করার প্রচেষ্টা করে এবং তারা জোর গলায় বলে- এ মঙ্গল শোভাযাত্রা আবহমান কালের বাঙালির সংস্কৃতি! কী আশ্চর্য! তাদের এ কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা শুনে শয়তানও বোধহয় লজ্জা পায়! কারণ- আপনি কখন আবহমান শব্দ প্রয়োগ করবেন? কোনো কিছু ঐতিহ্য কিংবা সংস্কৃতি বলে গণ্য হবে তখন যদি সেই ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম লাগাতার চলতে থাকে। তখন বাংলা ভাষায় আবহমানকাল শব্দকে সাধারণত ব্যবহার করা হয়। অথচ আমরা দেখি এ মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম শুরু হয় যশোরে ১৯৮৫ সালে। পরে ১৯৮৯ সালে ঢাকায় শুরু হয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের দ্বারা। যদিও প্রথম দিকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বলে এ উৎসব আয়োজন হয়নি বরং এর নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। এখন আপনি বিচার করুণ! মাত্র ৩০-৪০ বছর আগ থেকে চালু হওয়া সংস্কৃতিকে কি আবহমানকালের সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য বলা যাবে?
ইসলামের দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ :
ইসলামে মুসলিমদের জন্য দুইটি দিবসকে আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই দুই দিন হলো- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এর বাইরে অন্য কোনো দিবস পালন করা চাই সেটা আনন্দ, উৎসবের নামে হোক, কিংবা বর্ষবরণের নামে হোক, ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সকল ইবাদত, আচার অনুষ্ঠান হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য তাঁর নির্দেশিত পথে এবং রাসূল -এর তরীকায়। এর বাইরে যে কোনো কাজেই হোক তা পরিত্যাজ্য। বিশেষত আচার অনুষ্ঠান উদযাপনে রাসূল বলেছেন :
من تشبه بقوم فهو منهم
‘যে কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচলিত পহেলা বৈশাখের ইসলামবিরোধী কতিপয় কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা :
১. দিবস পালন:
ইসলামী শরীয়তে কেবলমাত্র দুইটি দিবসকে গোটা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এর বাইরে যে কোনো দিবস পালন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। চাই সেটা পহেলা বৈশাখ হোক কিংবা ভালোবাসা দিবস হোক আর জন্মদিবস অথবা মৃত্যুবার্ষিকী।
২. মঙ্গল শোভাযাত্রা :
ইসলামী বিশ্বাস হলো- মহান আল্লাহ তা‘আলা কল্যাণের নির্ধারক। কোনো শোভাযাত্রা, দিবস, বস্তু কিংবা স্থান, সময়ের কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং এর কোনো ক্ষমতাও নেই। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো দিবস, বস্তু ইত্যাদির কল্যাণের ক্ষমতা বা শক্তি রয়েছে নিঃসন্দেহে সে শির্ক ও কুফরী করল। তাঁর ঈমান নষ্ট হয়ে গেল। যদিও আধুনিক ইসলামবিদ্বেষী, প্রকৃতিবাদী ও সুশীল সমাজ বলে- এ শোভাযাত্রা সকল অমঙ্গলকে দূরীভীত করে কল্যাণ নিয়ে আসে!
এখানে খুব ভালো করেই মনে রাখতে হবে- মহান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কোনো শক্তি নেই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার, এমনকি প্রকৃতিরও নেই।
৩. দিবসের নামে বেহায়াপনা :
অনৈসলামিক যত দিবস উদযাপন করা হয় সেই সকল দিবসে কমবেশি বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, বিদ‘আত, কুফরী ইত্যাদি চর্চা হয়ে থাকে। তবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে শির্ক, বিদ‘আত, কুফরী এগুলো যেমন চর্চা হয় তার সাথে সমানতালে অশ্লীলতা, বেহায়াপনারও চর্চা হয়ে থাকে।
৪. নোংরা পোশাক প্রদর্শন :
পহেলা বৈশাখ যেহেতু বাঙালি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, তাই বিভিন্ন শিল্প কারখানা বৈশাখের আমেজে ঢাক, ঢোল, তবলা, গিটার, বিভিন্ন প্রাণীর অঙ্গভঙ্গির ছবি, অংকন দিয়ে তৈরি করে বিভিন্ন রকমের পোশাক। সেই সাথে আঁটোসাঁটো পোশাক ও পাতলা আবরণের পোশাকেরও হয় সস্তা সৌন্দর্য প্রদর্শন। যেটা ইসলামী শরীয়তে হারাম।
৫. বিভিন্ন ট্যাটু,ছবি প্রদর্শন :
পহেলা বৈশাখের এ উদযাপনে মহান আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি মানুষের অবয়বকে বিভিন্ন জীব জন্তুর ছবি, প্রতিকৃতির দ্বারা অবমাননা করা হয়। শিক্ষিত নামের মূর্খরা বানর, পেঁচার প্রতিকৃতির সাজসজ্জা করে নিজেদের জীব-জন্তুতে পরিণত করছে! ফলত এ উদযাপনকে আনন্দঘন করতে তারা বিভিন্ন প্রতিকৃতি, মূর্তির ছবি তৈরি করে। যেটা ইসলামে হারাম। রাসূল বলেছেন : নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে সর্বাধিক ঘৃণিত বা আযাবপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলো ছবি অথবা প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারী।
সুধী পাঠক! ইসলাম সামগ্রিকভাবে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। সকল ক্ষেত্রে ইসলাম আমাদের জন্য যে নীতিমালা, দিকনির্দেশনা প্রদান করে সে অনুযায়ী আমাদের জীবনকে পরিচালিত করতে পারলে আমাদের উভয় জীবন সফল হবে ইন শা-আল্লাহ। শয়তান যতই তার শয়তানী নীলনকশা তৈরি করে আমাদের সামনে পেশ করুক না কেন, আমাদের কোনোমতেই তার পাতানো ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। চাই সেটা ইবাদতের ক্ষেত্রে হোক কিংবা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে হোক। তাই আসুন আমরা ঈমান বিধ্বংসী এ প্রচলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে নিজ পরিবার থেকে শুরু সমাজ ব্যবস্থায় সচেতনতা তৈরি করি। মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে ঈমান বিনষ্টকারী সকল কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজত করুক, আমীন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ই এপ্রিল, ২০১৪।
আবু দাউদ হা : ৪০৩১।
সহীহ বুখারী হা : ৫৫১৮।
সাপ্তাহিক আরাফাত
৬৭বর্ষ ২৫-২৬সংখ্যা
৬ এপ্রিল ২০২৬



