বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সা.- এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ কৃষক, কেউ কামার আর কেই রাখাল। কোনো পেশাই ছোট নয় এটা ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম সব বৈধ পেশা ও পেশাজীবীকে সম্মান করতে নির্দেশ দেয়। আমরা আজকের লেখায় মদীনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভিন্ন কাজ ও পেশা নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ। এতে এও প্রতীয়মান হবে যে, সাহাবায়ে কেরাম একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য সকলেই প্রাণপনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পাশাপাশি এও প্রমাণ হবে যে, নাবী সাঃ ও সাহাবায়ে কেরাম শুধু বহিঃশক্তির সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তথা গণীমত, ফাই বা খারাজ দিয়েই তাদের রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যোগান দেননি; বরং সকলেই মিলে শ্রম দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। মূলত একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের জন্য সে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণী পেশার নাগরিককেই আন্তরিকতার সাথে পেশাগত দায়িত্বের আঞ্জাম দিতে হয়। আবার রাষ্ট্রপ্রধানকেও সকল পেশাজীবী মানুষকে মূল্যায়ন করতে হয়। মদীনার শিশু ইসলামী রাষ্ট্রে উভয়টি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল।
আল কুরআনে শ্রমের তাকিদ : পবিত্র কুরআনুল কারীমে মহীন আল্লাহ বিভিন্ন আয়াতে শ্রমের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, وجعلناالنهار معاشا -“এবং দিনকে কি জীবিকা উপার্জনের সময় করে দেইনি?” [সূরা আন নাবা: ৭৮/ ১১]
আল্লাহ আরো বলেন,
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلٰوةُ فَانتَشِرُوا فِى الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“তারপর যখন নামায শেষ হয়ে যায় তখন ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।” [সূরা আল জুমআ: ৬২/১০]
হাদীসে শ্রমের মর্যাদা : নাবী সাঃ শ্রমের মর্যাদা দিয়েছেন, শ্রমের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,
لأن يحتطب أحدكم على ظهره حزمة من حطب خير له من أن يسأل الناس أعطوه أو منعوه
“নিজে কাঠ কেটে পিঠে বহন করে বিক্রি করাই উত্তম কারো নিকটে যাঞ্চা করার চাইতে। কারণ যাঞ্চা করলে কেউ দিবে তো কেউ দিবে না।” [সহীহুল বুখারী, ২২৪৫]
তিনি আরো বলেন,
ما أكل أحد طعامًا خيرًا من أن يأكل من عمل يده، وإن نبي الله داود كان يأكل من عمل يده
“নিজের হাতে উপার্জনের চাইতে উত্তম রিয্ক আর কেউ ভক্ষণ করে না। আর আল্লাহর নবী দাউদ নিজ হাতে কর্ম করতেন।” [সহীহুল বুখারী, ২০৭২]
সব শ্রেণী পেশার মানুষকে রাসূলের সা. সম্মান : তৎকালীন জাহেলী আরবে কিছু পেশাকে সম্মান করা হত আর কিছু পেশাকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। যেমন মদীনার লোকদের কৃষি ছিল প্রধান পেশা। মক্কার লোকদের প্রিয় ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। শিল্পের কথা বললে বলা যায়, সেকালে কাপড় তৈরী, সুতা বুননকে ভালো পেশা বলে ধরা হত। কিন্তু লোহার কাজকর্মকে ঘৃণা করা হতো। এজন্য যারা কামারের পেশায় নিয়োজিত থাকত তারা সকলেই ছিল দাস প্রকৃতির। স্বাধীন ব্যক্তিদের কেউ এই পেশায় নিজেকে জড়াত না। রাসূল সাঃ তার সন্তান ইবরাহীমকে কামার আবুু সাইফের স্ত্রীর নিকটে দুধ পানের জন্য রেখেছিলেন এবং মাঝে মধ্যেই তার বাড়ি যেতেন, আবু সাইফের সাথে বসে গল্প করতেন ও ইবরাহীমকে দেখে আসতেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনি কামারদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কাজ ছোট হলেও সেটাকে অবহেলা করা বা ঘৃণা করা জাতির অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে ভেঙ্গে দেয়। এর সুযোগে ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো সিন্ডিকেট করার সুযোগ পায়। বাজারদর বৃদ্ধি পায়। সাহাবায়ে কেরামও রাসূলের অনুসরণ করেছেন। যে পেশাকে এতদিন হেয় করা হতো সেটাকে নাবী সাঃ মর্যাদা প্রদান করলেন।
নাবী সা.- এর যুগে বিভিন্ন পেশা :
১. শিকার : জীবিকার তাগিদে, শখের বশে বা শরীরচর্চার জন্য অনেকেই শিকার করত। মক্কায় রাসূল সা. -এর চাচা হামযা রা. একজন দক্ষ শিকারী ছিলেন। তাকে ‘সাবিবুস সাইদ’ বা শিকারী বলে ডাকা হতো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা শিকারের কথা উল্লেখ করেছেন,
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَيَبْلُوَنَّكُمُ اللَّهُ بِشَىْءٍ مِّنَ الصَّيْدِ تَنَالُهُۥٓ أَيْدِيكُمْ وَرِمَاحُكُمْ لِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَخَافُهُۥ بِالْغَيْبِ ۚ فَمَنِ اعْتَدٰى بَعْدَ ذٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ এমন শিকারের মাধ্যমে তোমাদের কঠিন পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করবেন যা হবে একেবারে তোমাদের হাত ও বর্শার নাগালের মধ্যে, তোমাদের মধ্য থেকে কে তাঁকে না দেখেও ভয় করে, তা দেখার জন্য। কাজেই এ সতর্কবাণীর পর যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালংঘন করলো তার জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল মায়িদা: ৫/ ৯৪]
২. কাঠ সংগ্রহ : কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা উপার্জন করা সে যুগে নাগরিকদের অন্যতম পেশা ছিল। এই পেশাঅনেকেই নিয়োজিত ছিলেন। এমনকি নাবী সা. এই পেশার প্রতি উদ্বুদ্ধও করেছেন। তিনি বলেন,
لأن يأخذ أحدكم حبله فيأخذ جزمة من حطب فيبيع فيكف اللهبه وجهه خير من أن يسأل الناس أعطي أو منع
“তোমাদের কেউ রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে আর এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে ভিক্ষা করা থেকে রক্ষা করেন এটাই তার জন্য উত্তম মানুষের নিকটে সওয়াল করার থেকে। সওয়ার করলে সে কখনও পায় তো কখনও পায় না।” [সহীহুল বুখারী, ১৪০২]
৩. পশুপালন : তৎকালীন আরবে পশুপালন জীবিকা উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। বিশেষত যেসব এলাকায় সবুজ ঘাস, তৃণ লতা জন্মাত সেসব এলাকার লোকেরা পশুপালনকেই তাদের জীবিকার প্রধান উপায় হিসেবে অবলম্বন করত। দক্ষিণ আরবের তুলনায় উত্তর আরবের বেশ কিছু এলাকায় ঘাস পাতা জন্মাত বেশী। এর কারণ ছিল উত্তর আরবে অধিক পরিমাণে বষ্টি। ফলে সেসব এলাকার লোকজন পশুপালনেই নিয়োজিত থাকত। বেদুঈন আরবদের প্রধান পেশা ছিল পশুপালন। জাহেলী যুগে তারা ডাকাতি রাহাজানিও করত। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের পর তারা পশুপালন করেই জীবন জীবিকা নির্বাহ করত। শহুরে আরবদের মধ্যে বিত্তশালী লোকদের অনেক উট ছাগলের পাল ছিল। সেগুলো দেখাশুনার জন্য একেকজনের কয়েকজন করে দাস কাজ করত।
৪. কৃষি : মদীনাবাসীদের কৃষি ছিল প্রধান পেশা। মদীনার খেজুর ছিল বিখ্যাত। এছাড়াও গম, আঙ্গুর, যব ইত্যাদিরও আবাদ হতো । নাবী সা. মদীনায় হিজরত করলে আনসারগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের খেজুর বাগানগুলোকে মুহাজির ও আমাদের মাঝে ভাগ করে দিন। নাবী সা. বললেন, না তার প্রয়োজন নেই। তারা বললেন, তাহলে আমরা বাগানে কাজ করব কিন্তু ফলের ক্ষেত্রে উভয়ে অংশীদার হব। [সহীহুল বুখারী, ২৩২৫]
মদীনা ও তার আশেপাশের উর্বর অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করার জন্য নাবী সা. নতুন কৃষি আইন জারি করেন। তিনি বলেন,
من أحيا أرضا ميتا فهو أحق وفي رواية من أحيا أرضا فله أجر
“যে ব্যক্তি অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করল সে ঐ জমির হকদার। অন্য বর্ণনায়, তার জন্য রয়েছে প্রতিদান।” [সহীহুল বুখারী, ২৩৩৫]
চাষযোগ্য জমিকে ফেলে রাখা নিষেধ করে নাবী সা. বলেন,
من كانت له أرض فليحرثها فإن كره أن يحرثها فليمنحها لأخيه فإن كره أن يمنحها فليدعها
“যার কোনো জমি আছে সে যেন চাষ করে, চাষ করতে না চাইলে সে যেন তার কোনো ভাইকে দান করে, দান করতে না চাইলে সে যেন তা পরিত্যাগ করে।” [সহীহ মুসলিম, ১৫৩৬]
এভাবে নাবী সা. কৃষিখাতকে উন্নত করার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন তিনি কাউকে অনাবাদি জমির দায়িত্ব প্রদান করেন, কাউকে পাহাড়ী ঝর্নার দায়িত্ব দেন যেন সে তা থেকে জমিতে সেচ করে অর্থ উপার্জন করতে পারে। কাউকে লবণাক্ত ভূমির দায়িত্ব দেন। মোটকথা, হিজরতের পর মদীনাকেন্দ্রীক বহুমুমুখী কৃষিব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
কৃষিকাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ : অস্বচ্ছল সাহাবীগণের স্ত্রীগণও তাদের সাথে কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করতেন। (তবে অবশ্যই শরঈ নির্দেশনা অনুসরণ করে)। আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন,
تزوجني الزبير وماله في الأرض من مال، ولا مملوك، ولا شيء غير ناضح وغير فرسه، فكنت أعلف فرسه، واستقي الماء، وأخرز غربه، وأعجن… وكنت أنقل النوى من أرض الزبير على رأسي، وهي مني على ثلثي فرسخ
“যুবাইর আমাকে বিয়ে করলেন। তার কোনো ফসলি জমি ছিল না, দাসও ছিল না। পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত একটি উট ও একটি ঘোড়া ছাড়া তার কোনো সম্পদ ছিল না। আমি ঘোড়াটিকে ঘাস খাওয়াতাম, পানি পান করাতাম এমনকি দুই মাইলের দুরত্বে তার জমি থেকে খেজুর বীজ মাথায় করে বহন করে নিয়ে আসতাম ।” [সহীহুল বুখারী, ৪৯৪৬]
জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন,
طَُلقت خالتي، فأرادت أن تجد نخلها فزجرها رجل أن تخرج، فأتت النبي صلى الله عليه وسلم،
فقال: “بلى فجدي نخلك، فإنك عسى أن تصدّقي أو تفعلي معروفاً” رواه مسلم، ومعنى تجدي نخلك: تقطعي ثمره
“আমার খালা তালাকপ্রাপ্তা হবার পর একদিন তার বাগানে খেজুর কাটতে বের হলে এক ব্যক্তি তাকে বের হতে নিষেধ করলেন। আমার খালা নাবী সা.- এর নিকট আসলে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি খেজুর কাট। এর দ্বারা তুমি হয়ত সদাকা করবে অথবা ভালো কোনো কাজ করবে।” [সহীহ মুসলিম, ১৪৮৩]
৫. ব্যবসায় বাণিজ্য: মক্কাবাসীর প্রধান পেশা ছিল ব্যবসা। সিরিয়া, ইয়ামান, মিসরসহ আশপাশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে তারা ব্যবসায়ী পণ্য ক্রয় করে এনে বিক্রি করত। বেশ লাভজনক ছিল এই পেশা । আমরা জানি ইসলামপূর্ব মক্কায় খাদিজা রা. একজন ধনাঢ্য নামকরা ব্যবযায়ী ছিলেন। নাবী সা. তার ব্যবসায়ী পণ দেখাশোনা করতেন। এছাড়াও তিনি ছোটবেলায় চাচা আবু তালেবের সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন করেছিলেন। মক্কায় উসমান রা., আবু বকর রা., আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. সহ অনেকেই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। হিজরতের পরেও মদীনা ইসলামী রাষ্ট্রে মক্কা থেকে আগত মুহাজিরগণ ব্যবসা শুরু করেন এবং উন্নতি লাভ করেন। নাবী সা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য একটি দুর্নীতি ও ভেজালমুক্ত বাজারব্যবস্থা জরুরি। অন্যদিকে মদীনার বাজার নিয়ন্ত্রণ করত ইহুদিরা। এক্ষণে যদি মদীনার বাজার মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে অর্থনৈতিকভাবে যেমন মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে (যেমনটি আধুনিক বিশ্বে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বেহাল দশা করে রেখেছে ইহুদি ব্যবসায়ী ও ধনকুবেররা), অন্যদিকে ভেজাল পণ্য আর সুদের সয়লাব হয়ে পড়বে ইসলামী রাষ্ট্রের বাজার। কারণ ইহুদিরা জাতিগতভাবে সুদ ও ঠকবাজির সাথে জড়িত। এজন্যই মূলত একটি ইসলামী বাজারব্যবস্থা প্রচলন জরুরি হয়ে পড়েছিল। সে সময় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নির্ধারণ করা খাঁটি স্বর্ণের তৈরীকৃত দীনার এবং পারস্য সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত রৌপ্য নির্মিত দিরহাম। নাবী সা. নতুন এই বাজারের অনেকগুলো আইন কানুন জারি করেছিলেন; যা একটি ক্রমবর্ধমান ও স্থীতিশীল বাজারব্যবস্থার জন্য আবশ্যকীয় ছিল। হাদীস ও ফিকহের কিতাবগুলিতে কিতাবুল বুয়ু অধ্যয়ন করলে যে যুগের হরেক রকমের ব্যবসা সম্পর্কে অবগত হওয়া যাবে ।
৬. হস্তশিল্প: কুটিরশিল্প বা হস্তশিল্পেও সে যুগে মহিলাগণ অবদান রেখেছিলেন। বাড়িতে বিভিন্ন প্রকার ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরী করত মহিলারা আর স্বামীরা সেগুলো বাজারে বিক্রি করত। সেসব তৈরীকৃত জিনিসের মধ্যে ছিল চামড়ার তৈরী হরেক রকমের পাত্র, খেজুরের চাটাই, বিভিন্ন পানপাত্র, যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্রসহ আরো কত কি। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল ছিলেন। তার স্ত্রী রায়েতা/ রিতা বাড়িতে হস্তশিলিপের কাজ করতেন। মুসনাদে আহমাদ ও সহীহ ইবনু হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে, ইবনু মাসউদের স্ত্রী নিজ হাতে কাজ করে পরিবার চালাতেন। এছাড়াও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল মুমিনীন যাইনাব রা. হস্তশিল্পে অভ্যস্ত ছিলেন। আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন,
“أسرعكن لحاقاً بي أطولكن يداً” فكن يتطاولن أيتهن أطول يداً. قالت: فكانت أطولهن يداً زينب رضي الله عنها، لأنها كانت تعمل بيدها وتتصدق، وإنها كانت امرأة قصيرة، ولم تكن أطولنا”
“তোমাদের মধ্যে যার হাত সবচেয়ে লম্বা সেই অমার সাথে সর্বাগ্রে মিলিত হবে। আয়েশা রা. বলেন, এরপর আমরা আমাদের মধ্যকার কার হাত বেশী লম্বা তা মাপা শুরু করলাম। (ইতোমধ্যে যাইনাব রা. সবার আগে রাসূলের সাথে মিলিত হলেন অর্থাৎ মারা গেলেন)। সুতরাং আমাদের মধ্যে তার হাতই ছিল সবচেয়ে বেশী লম্বা কারণ তিনি নিজ হাতে কাজ করে যা উপার্জন করতেন তা দান করে দিতেন। তিনি খর্বকায় হলেও দানের কারণে তিনিই ছিলেন লম্বা হাতের অধিকারীণী।” [সহীহল বুখারী, ১৪২০, সহীহ মুসলিম, ২৪৫২]
৭. অস্ত্রশিল্প: লৌহকর্ম বা অস্ত্রনির্মাতাদেরকে আরবীতে বলা হাদ্দাদ বা কামার। বদর পরবর্তী সময়ে মুলিমগণ বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বদর, ওহুদ, খন্দক এমন বড় বড় গাযওয়া ছাড়াও ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে অনেক ছোট ছোট অভিযান বা সারিয়া পরিচালনা করতে হয়। স্বভাবতই এসব অভিযানের জন্য বহু প্রকার অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে অস্ত্রনির্মাতা কামারগণ সে চাহিদা পূরণ করেন। অস্ত্র নির্মাণে কাঠের ব্যবহারও লক্ষণীয়। এভাবে মদীনা ইসলামী রাষ্ট্রে লৌহশিল্প ও কাষ্ঠশিল্পের সমান্তরাল অভিযাত্রায় অস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন প্রকার অস্ত্রের মধ্যে ছিল,
(ক) দাব্বাবা (الدبابة) : মোটা চামড়া বেষ্টিত কাঠের তৈরী বিশেষ বস্তু; যা তীর ও তরবারির আঘাত থেকে বাঁচতে ঢালের কাজ করে।
(খ) যবর (الضبر) : এটিও চামড়া বেষ্টিত এক প্রকার ছোট ঢাল; যা দ্বারা যোদ্ধারা তাদের দেহের পশ্চাতদেশ রক্ষা করতেন।
(গ) হাসাক (الحسك) : কাটাওয়ালা অস্ত্র: দূর্গের ফটকে রাখা হত শত্রুবাহিনীকে মারার জন্য।
(ঘ) মিনজানিক (المنجنيق) : কাষ্ঠনির্মিত বিশাল অস্ত্র; যার মাথায় বড় বড় পাথর রেখে পিছন থেকে অনেকজন মিলে প্রচন্ড চাপ দিতে হত। শত্রুর দূর্গের দেয়ার ভেঙ্গে ফেলার জন্য ব্যবহৃত হত। ইবনু হিশাম তার সিরাতে এবং মাকরেযি তার খুতাতে উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন আবরে মুসলমানরাই সর্বপ্রথম মিনজানিক ব্যবহার করেন। নাবী সা. তায়েফবাসীর বিরুদ্ধে এই অভিনব অস্ত্র প্রথম ব্যবহার করে তায়েফের দূর্গ জয় করেন।
৮. সেলাই শিল্প : নাবী সা.- এর যুগে অনেকেই দর্জির কাজ করতেন। কাপড় সেলাই তাদের পেশা ছিল। মদীনা নগরী শহর হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা সেলাই করা কাপড় পরিধান করতেন। পক্ষান্তরে বেদুঈনরা সাধারণত সেলাই করা কাপড় পরিধান না করে চাদর জাতীয় সেলাইবিহীন কাপড় ব্যবহার করতেন। সমাজ বিজ্ঞানী ইবনু খালদুন রহ. তার মুকাদ্দিমায় বলেন,
وهذه صناعة مختصة بالعمران الحضري لما أن أهل البدو يستغنون عنها وانما يشتملون الأثواب اشتمالا ,وإنما تفصيل الثياب وتقديرها وإلحامها بالخياطة للباس من مذاهب الحضارة وفنونها
এটি (সেলাই করা কাপড় পরিধান করা) বিশেষ করে শহর এলাকার কালচার। কেননা বেদুঈনরা এর থেকে মুক্ত ছিল। তারা গায়ে কাপড় জড়িয়ে ব্যবহার করত। কিন্তু মেপে মেপে কাপড় কেটে তা সেলাই করার যে রীতি তা শহরবাসীর। [ইবনু খালদুন, আল মুকাদ্দিমা]
ইমাম বুখারী রহ. দর্জির আলোচনা باب ذكر الخياط নামে একটি অধ্যায় রচনা করে নিম্মোক্ত হাদীসটি নিয়ে এসেছেন,
إن خياطاً دعا رسول الله صلى الله عليه وسلم لطعام صنعه , قال أنس بن مالك رضي الله عنه فذهبت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى ذلك الطعام
এক দর্জি নাবী সা. কে দাওয়াত করল। তিনি সেখানে গেলেন। আনাস রা. বলেন, আমিও রাসূল সা.- এর সাথে গেলাম। [সহীহুল বুখারী, ৫০৬৪]
এছাড়াও সাহাবায়ে কেরাম তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর ও শক্তিশালী রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা মুসলিম উম্মাহ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে ।




