স্মৃতিচারণ : প্রফেসর এ কে এম শাসমুল আলম স্যারের সাহচর্যে কিছুক্ষণ

তানযীল আহমাদ

[…কাফী সাহেব ওখানে এসে ১৪ দিন থাকলেন। এই ১৪ দিনে তিনি ১৪ টা মসজিদকে এক জামে মসজিদে পরিণত করলেন। বাকীগুলা ওয়াক্তিয়া হিসেবে বহাল থাকল। বল্লায় এখনো কিন্তু ওভাবে আছে।]

গত ১৬ তারিখে যাত্রাবাড়ীস্থ এম এম আরাবিয়ার ২য় তলার একটি কক্ষে প্রফেসর এ কে এম (আবুল কালাম মুহাম্মাদ) শামসুল আলম স্যারের সাথে শুব্বানের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ফারুক ভাই, সহ -সভাপতি ইসহাক মাদানী ভাই, যুগ্ম-সাধারণ. সম্পাদক রবিউল ইসলাম ভাই ও আমি তানযীল আহমাদ সাক্ষাতের সুযোগ লুফে নিয়ে দেখা করি। শামসুল আলম স্যার আরবদের নিকটে আবুল কালাম নামে আর আমাদের নিকট আলম স্যার নামে বেশ পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সাবেক সভাপতি (২০০৩-২০০৮) , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ এবং স্বনামধন্য আহলে হাদীস নেতা ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাদৃত। আরো বড় ব্যাপার হলো, তিনি একজন সফল ও সুযোগ্য শিক্ষক হিসেবেও সর্বমহলে প্রসংশিত। তাইতো অবসর গ্রহণ করার পরেও এই বয়সে তিনি সুদূর রাজশাহী থেকে এম এম আরাবীয়াতে এসে উচ্চতর কোর্সের ক্লাস নেন।

আমরা সকলেই নিজেদের পরিচয় দিলাম। আব্দুল্লাহ ফারুক ভাই বললেন, স্যার আমরা আসলে আপনার নিকটে কয়েকটি আবেদন নিয়ে এসেছি। তিনি বললেন, বলো। ফারুক ভাই বললেন, আমাদের জমঈয়ত ও শুব্বানের পথ পরিক্রমা নিয়ে একটি তথ্যবহুল ও প্রকৃত ইতিহাস সম্বলিত ডকুমেন্ট দরকার। যা আমরা আপনার মাধ্যমে আশা করছি। কারণ আমরা গত রমাযান মাসে দেশব্যাপী প্রায় ১২৯ টির মতো কেন্দ্রে কুরআন শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি, গত জুলাই ও আগস্ট মাসকে শাখা বৃদ্ধির মাস হিসেবে পালন করেছি এবং সারাদেশে আলহামদুলিল্লাহ ১৪১ টি শাখা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু অনেক জায়গায় আমাদেরকে আমাদের সূচনা ইতিহাস নিয়ে আমাদেরই অন্য সংগঠনের ভাইয়েরা নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে। আমরা যদি তাদেরকে সত্য ইতিহাসটা জানাতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। (ফারুক ভাই ঘরের ভেতরেও শুদ্ধ ভাষার চর্চা করেন) স্যার বললেন, এগুলো তো আসলে একাডেমিক ব্যাপার, লিখলে সেভাবেই লিখতে হবে। আমরা বললাম যে স্যার আমরা আপনাকে সার্বিক সহযোগিতা করব। স্যার বললেন, আমি তো কিছু লেখছি আরাফাতে। ২০০৮ সালে পাকিস্তান সফর থেকে ফিরে এসে আরাফাতে প্রায় ২৮ টি পর্বে লেখা দিয়েছি। তোমরা ওটা সংগ্রহ করো। আমরা বললাম, ঠিক আছে স্যার। কম্পিউটারে তা তো থাকবেই। এরপর তিনি তার পাকিস্তান সফরের ইতিবৃত্ত শোনালেন। বললেন, আমি এ পর্যন্ত ১৪টি দেশে ২৬ টি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করছি। তবে পাকিস্তানের মারকাযী জমঈয়তে আহলে হাদীসের ২০০৮ সালের কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে মনে রাখার মতো ব্যাপার। লাহোরে অনুষ্ঠিত সেই কনফারেন্সে ৭০০,০০০ (সাত লক্ষ) লোকের সমাবেশ হইছিলো। কয়েকদিন আগেও সেখানে পাকিস্তান জামাআতে ইসলামীর সমাবেশ হইছে। তাদের লোক ছিল ৩০০,০০০ (তিন লক্ষ)। পাকিস্তানে আহলে হাদীসদের জাতীয় কনফারেন্সে সেখানকার আহলে হাদীস সকল সংগঠন এক টেবিলে বসে। একই মঞ্চে বসে কনফারেন্স করে। সেখানে আল্লামা ইহসান ইলাহী জহিরের দল জমঈয়তে আহলে হাদীসও একসাথে সম্মেলন করে। এটা খুব ভালো। এমনকি কাশ্মীরের মুজাহিদরাও এখানে আসে। সেসময় গোটা লাহোরে শ্লোগান দেয়া হতো “আহলে হাদীস মানযিল বা মানযিল”- ঘরে ঘরে আহলে হাদীস। মোট ২০০ জন দেশী বিদেশী বক্তা। সময় ৫ মিনিট করে। আমি আরবীতে শুরু করলাম। সবাই বলল ‘হাম উর্দু চাহিয়ে’। আমি এবার নোট বন্ধ করে উর্দুতে শুরু করলাম। টানা ৪৫ মিনিট বক্তব্য দিলাম। কনফারেন্সের পর আলামী জমঈয়ত (আন্তর্জাতিক জমঈয়ত) গঠনের জন্য মিটিং হলো। একজন বললেন সবচেয়ে বেশি আহলে হাদীস বাস করে বাংলাদেশে। তিন কোটি। অন্য দেশে এত আহলে হাদীস নাই। সুতরাং বাংলাদেশ থেকেই আলামী জমঈয়তের সভাপতি হবে। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম আমাদের দেশে জমঈয়তের নিজস্ব কোনো ভবন নাই, অবকাঠামো, লজিস্টিক সাপোর্টও এদের মতো নাই। এদের ৬তলা কেন্দ্রীয় অফিস এত উন্নত যে কা’বার ইমাম সাহেবকে তারা হোস্টেলে না রেখে মারকাযী অফিসেই রেখেছে। তাদের তুলনায় আমাদের তো তেমন কিছুই নাই। তাই আমি সেই প্রস্তাব ফেরত দিলাম। মক্কার দারুস সালাম লাইব্রেরীর প্রকাশক আব্দুল মালেক মুজাহিদ বললেন, আপনারা চাইলে আলামী জমঈয়তের জন্য আমি মক্কায় একটা বাড়ির ব্যবস্থা করব। সেখানে আমরা সবাই মিটিং করতে পারব।

শুব্বানের ছেলেরা বলল স্যার আপনাকে ইসলামাবাদে যেতে হবে। আমি বললাম সভাপতি সাহেব প্রফেসর সাজিদ মীরকে (মারকাযী জমঈয়তে আহলে হাদীস পাকিস্তানের সভাপতি, পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য) বলো। তিনি যদি ব্যবস্থা করেন তাহলে যাব। তারা তাকে বলল। তিনি মিটিং করলেন। যাবার ব্যবস্থা করলেন। সাথে কয়েকজনকে সফরসঙ্গী হিসাবে যেতে বললেন। আমার আবু তোরাবের নাম মনে আছে। সেখানকার শুব্বান খুব শক্তিশালী। কনফারেন্সের বিস্তারিত সংবাদ পাকিস্তানের সব টিভিতে দেখাইছে। আমরা একটা হাইজ নিয়ে রওয়ানা দিলাম। লাহোর থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত আমি কনফারেন্সের মোট ৪৮ টি গেইট হিসাব করছি। আরো হয়ত ছিল। ইসলামাবামাদ শহরে ৪৫ টি আহলে হাদীস মসজিদ আছে। মসজিদগুলো বেশ প্রাচীন। আমি মোট ১৪ টি মসজিদে গিয়ে বয়ান করেছি। বেশ সম্মান করেছিল তারা। কাশ্মীরের ভাইয়েরা বলল আপনাকে কাশ্মীর যেতে হবে। আমার বহু দিনের স্বপ্ন ছিল কাশ্মীরে যাওয়ার। হাঁ বলে দিলাম। আমাকে নিয়ে কাশ্মীরে যাওয়া হলো। আমরা ঝিলাম নদী পার হয়ে কাশ্মীর পৌছলাম। কাশ্মীর প্রবেশের সময় দেখলাম রাস্তায় মাইকিং হচ্ছে। শুনলাম, ‘বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস কো সাহেবে সদর শামসুল আলম কাশ্মীর মে হ্যায়। আজ উস মসজিদ মে তাকরীর ফরমায়ে গি’। শুনে খুব ভালো লাগল। বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে বয়ান করলাম। অতঃপর আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। বিশাল উঁচু পাহাড়। প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে উঠলাম। পাহাড়ের শীর্ষে উঠে জানলাম আমরা ১৩ টা জেলা ক্রস করছি। সবগুলাই পাহাড়ে অবস্থিত। পাহাড় থেকে নিচে আপেলের বাগান আর বাগান। পাহাড় বেয়ে ঝরনা বইছে। এ যেন আল্লাহর বানী جنّاتٌ تَجري مِن تَحتِها الأنهار ‘এমন জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাবিত’ (সূরা আল-বাকারা ২:২৫) আয়াতের বাস্তবতা। আমার মনে পড়ে গেল “আগার জান্নাতুল ফিরদাউস ভি জামিনাস্ত হামিনাস্ত হামিনাস্ত হামিনাস্ত” (সম্রাট জাহাঙ্গীর বলেছিলেন)। কাশ্মীর সরকারী পার্লামেন্টে ইসলামী শরীয়া কাউন্সিল আছে। সেখানে ১০০ জন সদস্য আছেন। ৯৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও একজন মন্ত্রীর মর্যাদা পান। আমি সেসময় কিছু মাজাল্লা (পত্রিকা) নিয়ে এসেছিলাম। সেখানকার শুব্বানের কর্মঠ কর্মী সাংবাদিক মাসরুর ‘লকবী আহলে হাদীস’ (আহলে হাদীস নামকরণ) নিয়ে ৫০০ পৃষ্ঠার একটা বই লিখছে। আমি ওটাও নিয়া আসছি। (আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম) ।

এরপর স্যার বললেন, আমি ঢাকায় এসে ঢাকার ভাইদেরকে বললাম। তারা কাশ্মীরের ভাইদের কথা শুনে আবেগ্লাপুত হলেন। মনে হলো তারা চেতনা ফিরে পেলেন । তারা বললেন, আমরা আল্লামা কাফী সাহেব যে মসজিদ থেকে জমঈয়তের কাজ শুরু করছিলেন আমাদেরকে সেখানে নিয়া যান। আমরা দেখতে চাই। প্রায় ৭০/৮০ জনের একটা বহর নিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম। আওলাদ হাজী সাহেবও ছিলেন। আমরা প্রথমে দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীতে অনেকগুলা কটেজ ভাড়া করে রাতে থাকলাম। দুই বেলা খাবার খেলাম। স্বপ্নপুরীর ভেতরে যে মসজিদ সেখানে ফজরের নামাজ পড়লাম। সবাই বলল কিছু বয়ান করেন। আমি আধা ঘন্টার মতো বয়ান করলাম। আমরা বিদায় নেয়ার সময় বিল দিতে গেলাম । মোট এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা বিল হইছে। মালিক বললেন আপনারা ছেলেদেরকে পাঁচহাজার টাকা দিয়ে দেন। বাকীটা দেয়া লাগবে না। আমরা তো অবাক হয়ে গেলাম। এত টাকা কেউ এভাবে ফ্রি দেয়! তিনি বললেন, আমিও আপনাদের সাথে ফজরের নামায পড়ছি । হুজুরের বয়ান শুনে আমার খুব ভাল লেগেছে। এজন্য আমি আপনাদের কাছে বিল নিতে পারব না।

(আমাদের আগ্রহের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেল)……..এবার স্যার বললেন, হ্যাঁ তোমরা বলো। আমরা বললাম স্যার, আমাদের জমঈয়তে যে বিভক্তি হলো সে ব্যাপারে আসলে একটা লিখিত কিছু থাকা দরকার । যেন আমরা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারি। কারণ অনেকে এমনও আচরণ আমাদের সাথে করেন যে বলার সুযোগটুকু পর্যন্ত দেয় না। স্যার বললেন, আসল ব্যাপার হলো ‘ইস ঘর কো আগ লাগি হ্যায়, ইস ঘর কি চেরাগ সে’ -ঘরের চেরাগই ঘরে আগুন লাগিয়েছে। যা হওয়ার তা তো হইছে। তোমরা কারো নাম নিয়া কখনো বদনাম করবা না। কারো দোষ ত্রুটি আলোচনার বিষয় বানাবা না। এটা আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। আমরা বললাম স্যার, শুব্বানের ছেলেরা কারো সমালোচনা করে না। স্যার বললেন যে দেখো, কবি ফারাযদাক আর জারিরের মাঝে চল্লিশ বছর শত্রুতা ছিল। দুই জনেই কবি। একে অপরের সমালোচক। চল্লিশ বছর পর কবি জারির বলল, আমার খুব সাধ হয় যে, ফারাযদাক আমাকে যদি দুই লাইন গালি দিত তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তার মানে গত চল্লিশ বছরে নিজের সমালোচককে ফারাযদাক একটি গালিও দেয় নাই ।

 ……..ফারুক ভাই বললেন, ……. তারা তো শুব্বান থেকে দূরে দূরে থাকতে চায়। আমাদেরকেও দূরে দূরে রাখে। তিনি বললেন, হতে পারে তোমাদেরকে বেশি ভালবাসে বলে। কারণ বালাগাতে আছে  سأطلب منكم بعد الدار   ‘আমি তোমাদের থেকে দূরে থাকি তোমাদের হৃদয়ে থাকার জন্য।’ এরপর আরেকটি প্রসঙ্গে স্যার বললেন দেখো, আলেমরা জাহেলদেরকে তোষামোদ করবে না। তারা সহযোগিতা করতে চাইলে নিবে, কিন্তু তোষামোদ চলবে না।  ……ফারুক ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুব্বানের শাখার ব্যাপার বললেন। স্যার পরামর্শ দিলেন। বললেন সেখানে তো মাসুদ আছে (স্যারের বড় ছেলে, আরবী ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক, শুব্বানের সাবেক দুই টার্মের সভাপতি)। তোমরা তার সাথে কথা বলো। আমরা বললাম, মাসুদ ভাই তো ছেলেদেরকে ডাকে, তারাও যায়। কিন্তু কেউ কেউ নাকি সমস্যা করে। স্যার বললেন, ঠিক আছে আমি দেখব।

 ………আল্লামা কাফী সাহেব সম্পর্কে তখন স্যার বললেন, কাফী সাহেব যে তাওহীদের দাওয়াত ও একই সাথে আন্দোলনমুখী ছিলেন এটা কিন্তু তিনি পেয়েছিলেন মওলানা আবুল কালাম আযাদের কাছ থেকে। দেখো ভারতের মতো দেশে তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তিনি নিজেই বলেছেন, মুসলমান না হলে আমিই প্রধানমন্ত্রী হতাম। আমরাও দেখি যে, মওলানা আযাদ গাড়ি থেকে নামলে পন্ডিত জওহারলাল নেহেরু গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে দাড়িয়ে থাকত। যাই হোক, মওলানা আযাদের বাপ কিন্তু পীর ছিলেন। এবং সেই সময় তার বাড়িতে ভারতের বিভিন্ন স্থানের ওহাবীদেরকে ধরে নিয়ে এসে পেটানো হতো। আযাদ তখন ছোট। জিজ্ঞাসা করতেন কেয়া হ্যায়? তারা বলত, তুম জানতা নেহি, ইয়ে ওহাবী হ্যায়। মওলানা আযাদ চিন্তা করত এরা কি তাহলে কুকুরের থেকেও খারাপ। কুকুরকেও তো মানুষ এভাবে পেটায় না। এরপর আযাদ নতুনভাবে লেখাপড়া শুরু করল। আসল জিনিস বুঝতে পারল। দৈনিক যামানা পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে একবার তাকে জেলে যেতে হয়। দৈনিক যামানা তখন ভারতীর মুসলমানদের একমাত্র মুখপত্র। সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ল আল্লামা কাফী সাহেবের উপরে। তিনি কিন্তু তখন মাত্র ২৪ বছরের যুবক। তোমরা চিন্তা করতে পারো? যেখানে অনেক বাঘা বাঘা উর্দু সাহিত্যিক বিদ্যমান সেখানে একজন বাঙ্গালী ছেলেকে সম্পাদনার দায়িত্ব দিলেন মওলানা আযাদ। কত বড় পন্ডিত হলে আযাদের মতো পত্রিকার সম্পাদনা করতে পারেন তিনি!!! কাফী সাহেব কিন্তু মওলানা আযাদের সংস্পর্শে এসে আন্দোলনমুখী চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হইছিলেন। কাজেই মওলানা আযাদকে বাদ দিয়ে নয়, তাকে নিয়েই তোমাদের পড়াশোনা করতে হবে। আহলে হাদীসের কথা বলতে গেলে তার নাম উচ্চারণ করতে হবে। ১৯৪৬ সালে রংপুরের সাদা মসজিদে কাফী সাহেব যে সংগঠন শুরু করেছিলেন, এরপর তিনি কলকাতার মিসরিগঞ্জে ফিরে গিয়ে চিন্তা করলেন আমি কোত্থেকে শুরু করব। এই বিশাল বাংলা ও আসাম নিয়ে আমি জমঈয়ত করলাম এটা কীভাবে শুরু করা যায় । এরপর একদিন টাঙ্গাইলের বল্লার লোকেরা তার কাছে গিয়ে ওয়াজ মাহফিলের দাওয়াত দিল। তিনি বললেন ঠিক আছে আমি যাব তবে শর্ত হলো আমি তোমাদের ওখানে একমাস থাকব। তারা তো আরো খুশী হলেন। কাফী সাহেব ওখানে এসে ১৪ দিন থাকলেন। এই ১৪ দিনে তিনি ১৪ টা মসজিদকে এক জামে মসজিদে পরিণত করলেন। বাকীগুলা ওয়াক্তিয়া হিসেবে বহাল থাকল। বল্লায় এখনো কিন্তু ওভাবে আছে। এরপর এভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি তার প্রথম সাংগঠনিক সফরেই চার মাস দশ দিন পর বাড়িতে ফিরলেন। আমি এ বিষয়ে একটা লেখাও দিয়েছি আরাফাতে ‘আল্লামা কাফীর প্রথম সাংগঠনিক সফর’ নামে।

………ড. এম এ বারী স্যারের কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ড. স্যারকে তার চাচা কাফী সাহেব কিন্তু মাদরাসায় পড়াইতে চাইছিলেন। কিন্তু তার বাবা আল্লামা আব্দুল্লাহেল বাকী বললেন যে না, ইউনিভার্সিটিতে পড়ুক। আর বাকী সাহেবও কিন্তু অনের বড় মাপের রাজনীতিবিদ ও আলেম ছিলেন। কায়েদে আযম জিন্নাহর মতো এত বড় ব্যক্তিও কিন্তু বাকী সাহেবের সভাপতিত্বে সভা করছেন। আবার একদল লোক বলে যে, ড. বারী সাহেব ইংরেজি জানা মানুষ। তিনি কিভাবে ইসলামী সংগঠনের নেতা হন। কিন্তু তারা জানে না যে, আরবী ভাষায় ড. বারী স্যার ঢাকা ভার্সিটেতে স্বর্ণপদক পাইছিলেন সেই সময়। যাই হোক।  ……আমীর ও ইমারতের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, আমি কয়েকদিন আগে মদীনার প্রফেসর ড. সুলাইমান আর রুহাইলির লেকচার শুনছিলাম ইউটিউবে। তিনি বললেন, الأمير من له الأمر

আমীর তো তিনিই যার ক্ষমতা আছে। ইসলামী হদ জারি করার পাওয়ার আছে। এ বিষয়ে আল্লামা আলিমুদ্দিনের বই আছে। একবার তিনি রাজশাহীতে আমার বাড়িতে আসলেন দুই দিন থাকবেন বলে। কিন্তু তিনি ১৪ দিন থাকলেন। তিনি সবসময় আমার লাইব্রেরিতে থাকতেন। এমনকি খাওয়ার সময় ডাইনিংয়েও যেতেন না। ডাইনিংয়ে যেতে বলা হলে বলতেন না, ওখানে আমার সময় নষ্ট হবে। আমরা লাইব্রেরিতেই তার খাবার দিয়ে আসতাম। সেখানেই তিনি একটা বই লিখলেন ‘আল আমীর ওয়াল ইমারাহ’ নামে। তিনি বিশেষ করে আদাবুদ দীন ওয়াদ দুনইয়া কিতাব থেকে কোড করেছেন বেশি। ……..এরপর তিনি বললেন আসলে আমি কী? আমি তো মনে করি আমি জমঈয়তের কারণেই এতদূর আসতে পেরছি। আল্লাহ আমাকে এত সম্মানিত করেছেন। জমঈয়ত না হলে তো মনে হয় আমি এতদূর আসতে পারতাম না। আমি চাই আমার পরিবারের মধ্যে (স্যারের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে, তিন জন ছেলে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী) পারিবারিক ভাবেই জমঈয়তের চর্চা হোক। তোমরা মাসুদকে কাছে টান। তাকে বুঝাও। সে তোমাদের প্রতি মনে হয় একটু মন খারাপ। কিন্তু সে প্রচুর লেখাপড়া করে। আমি আশা করি তার দ্বারা অনেক কিছুই হবে। আমার গোটা শিক্ষকতার জীবনে মাত্র ১৩/১৪ জন আমার আন্ডারে পিএইচডি করছে। কিন্তু ওর আন্ডারে ইতিমধ্যেই ৭/৮ জন করে ফেলছে। আমরা বললাম জমঈয়ত থেকেই মাসুদ ভাইকে মূল্যায়ন করা দরকার।

 ……..স্যার বাইরে বের হবেন একটু হাটাহাটি করার জন্য। আরাবিয়ার ছাত্র মুজাহিদকে আসতে বললেন। আমরাও একসাথে স্যারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম এমন জীবন্ত, সজীব ও সজ্জন একজন জ্ঞানী ব্যক্তির সৌম্যদর্শন নূরানী চেহারার দিবে। আর কল্পনার ভেলায় চড়ে ভাসছিলাম মারকাযী জমঈয়তের সাত লক্ষ মানুষের সমাগমস্থলে, কাশ্মীরের মাইকিং আমার কানে তখনও বাজছিল।

শ্রুতি থেকে লেখা।

Facebook

ড্যাশবোর্ড

পাঁচ দফা কর্মসূচি

তাওহীদ ও রিসালাতে মুহাম্মাদী সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন ও অনুশীলন।

ছাত্র ও যুব সমাজের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান।

ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।

যুব শক্তিকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানদান।

অনৈসলামিক রীতিনীতি প্রতিহত করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।

পছন্দের অপশনে ক্লিক করুন

আপনার সহযোগিতা জমা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ

একখনি করুন