রিবা বা সুদ অর্থনীতির পুরনো ও জটিল একটি বিষয় এবং শোষণের হাতিয়ার। বেদ, তাওরাত ও ইনজিলে সুদকে সমস্যা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটলের মতো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং হিন্দু ও ইয়াহূদী সংস্কারকগণ সুদী কারবারের নিন্দা করেছেন। মিসর, রোম, গ্রীস, ভারতবর্ষ প্রভৃতি এলাকায় সুদ নির্মূলে আইন রচিত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটনে আইএমএফ-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় স্বীকার করা হয়েছে যে, সুদের উচ্চ হারই বিশ্বের সর্বত্র উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
ربا‘রিবা’ আরবী শব্দ। এর অর্থ হলো বৃদ্ধি, আধিক্য, অতিরিক্ত, স্ফীতি, সম্প্রসারণ ইত্যাদি। ইসলামে সকল বৃদ্ধিকে ‘রিবা’ বলা হয়নি; বরং ইসলামী শরীয়তে কেবল সেই বৃদ্ধিকে ‘রিবা’ বলা হয়েছে, যা প্রদত্ত ঋণের আসলের উপর ধার্য ও আদায় করা হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জাহেলিয়াতের যুগে আরব দেশে মানুষ অর্থ ধার দিত, অতঃপর ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে পূর্বচুক্তি মোতাবেক অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতো, অথচ আসল অপরিবর্তিত থাকত। অনেকে পণ্যসামগ্রী ও শস্য ধার দিত এবং অতিরিক্ত পণ্য ও শস্যসহ আসল ফেরত নিত। তদানিন্তন আরবে আসল ঋণের উপর ধার্য ও আদায়কৃত এই অতিরিক্ত অর্থ, পণ্য বা শস্যের পরিমাণকে বলা হতো ‘রিবা’। আল কুরআন এবং সুন্নাহতে এ ‘রিবা’কে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
‘রিবা’ বা সুদ দুই ধরনের। যথা: ১. ‘রিবা নাসিয়া’ ও ২. ‘রিবা ফদল’।
রিবা নাসিয়া (النسيئة الربا):
সাধারণত ঋণের ক্ষেত্রে ‘রিবা নাসিয়া’র উদ্ভব হয়। এ শ্রেণীর রিবাকে জাহিলী যুগের রিবা ) رباالجاهليه), প্রত্যক্ষ রিবা(ربا المباشره), কুরআনে বর্ণিত রিবা (ربا القران), ঋণের রিবা(ربا القروض), ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করা হয়। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম একে(الربا الجلي) তথা প্রকাশ্য রিবা বলেছেন। ঋণদাতা কোন অর্থ বা পণ্য ঋণ হিসেবে দেয়ার বিনিময়ে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সময়ের ব্যবধানে পূর্বনির্ধারিত হারে বা পরিমাণে ঋণ বাবদ দেয়া অর্থ বা পণ্যের অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করলে তাকে বলা হয় ‘রিবা নাসিয়া’। মনে করি, ক খ-কে ১০০ টাকা এক বছরের জন্য এ শর্তে ধার দেয় যে, এক বছর পর খ উক্ত ১০০ টাকার সাথে অতিরিক্ত আরও ২০ টাকা ফেরত দেবে। তাহলে এই অতিরিক্ত ২০ টাকা হবে ‘রিবা নাসিয়া’। এভাবে ঋণদাতা যদি ঋণগ্রহীতাকে ১০০ কেজি লবণ এ শর্তে ধার দেয় যে, ছয় মাস পর ঋণগ্রহীতা ১২০ কেজি লবণ ফেরত দেবে, তাহলে এই অতিরিক্ত ২০ কেজি লবণ হবে ‘রিবা নাসিয়া’।
রিবা নাসিয়া কুরআন দ্বারা নিষিদ্ধ। এ সংক্রান্ত আয়াতগুলো ৪টি স্তরে নাযিল হয়।
এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের প্রথম আয়াত নাযিল হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মক্কী যুগে এবং হিজরতের ৫ বছর পূর্বে। এ আয়াতে বলা হয়েছে:
﴾ وَمَا آتَيْتُم مِّن رِّبًا لِّيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِندَ اللَّهِ ۖ وَمَا آتَيْتُم مِّن زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ ﴿
“মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকো, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধনসম্পদ বৃদ্ধি করে না, কিন্তু যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য দিয়ে থাকো, (তা-ই বৃদ্ধি পায়।) তারাই সমৃদ্ধিশালী।” (সূরা রূম: ৩৯)
দ্বিতীয় আয়াত:
হিজরতের কাছাকাছি সময় ইয়াহুদীদের অতীত কীর্তিকলাপ উল্লেখ প্রসঙ্গে নিষ্ঠুর অর্থলোভী ইহুদিদের সুদখোরীর কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴾وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا﴿
“এবং তাদের সুদ গ্রহণের জন্য, যদিও তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য, আর আমি তাদের মধ্যে অবিশ্বাসীদের জন্য কষ্টদায়ক শাস্তি তৈরি রেখেছি।” (সূরা নিসা: ১৬১)
তৃতীয় আয়াত:
রাসূলে করীম (সা.)-এর মাদানী যুগে উহুদ যুদ্ধের পর এ আয়াত নাযিল হয়:
﴾ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿
“হে ঈমানদারগণ। তোমরা এই চক্রবৃদ্ধি সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩০)
সর্বশেষ আয়াত:
সুদ সম্পর্কে আল-কুরআনের সর্বশেষ আয়াত নাযিল হয় মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনমিশন যখন সম্পূর্ণ হতে চলেছে, সে সময়। উমর (রা.) রিবা সংক্রান্ত সূরা বাকারার আয়াতকে রাসূল (সা.) এর ওপর নাযিলকৃত সর্বশেষ আয়াত বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু আব্বাস বলেন, “শেষ যে আয়াত রাসূল(সা.)এর ওপর নাযিল হয়েছিল তা ছিল আয়াতে রিবা।” কুরআন মজীদে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴾الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا ۗ وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ۚ فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىٰ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ﴿
“যারা সুদ খায়, তারা সেই ব্যক্তিরই মত দাঁড়াবে যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এজন্য যে, তারা বলে: ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার রবের এ নির্দেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যারা আবার আরম্ভ করবে, তারাই জাহান্নামী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” (সূরা বাকারা: ২৭৫)
﴾ يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ ﴿
“আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না।” (সূরা বাকারা: ২৭৬)
﴾ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴿
“যারা ঈমান আনে, নেক কাজ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের পুরস্কার তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই ও তারা দুঃখিতও হবে না।” (সূরা বাকারা: ২৭৭)
-يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿
﴾ فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর সুদের যা বকেয়া আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমরা না ছাড়ো, তবে আল্লাণু এবং তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না।” (সূরা বাকারা ২৭৮-২৭৯)
এভাবে একটি অতি পুরনো ও জটিল ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা এ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও সহজ পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন।
রিবা ফদল :
সমজাতীয় দ্রব্য হাতে হাতে বিনিময়ের ক্ষেত্রে ‘রিবা ফদল’-এর উদ্ভব হয়। এ শ্রেণীর রিবাকে ব্যবসায়ের রিবা(ربا البيوع), সুন্নাহ বর্ণিত রিবা(ربا السنة)ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করা হয়। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম এ শ্রেণীর নগদ রিবাকে অপ্রকাশ্য রিবা (ربا الخفي) বলেছেন। কোন দ্রব্যের সাথে একই জাতীয় দ্রব্য বাড়তি পরিমাণ বিনিময় করলে দ্রব্যের উক্ত অতিরিক্ত পরিমাণকে ‘রিবা ফদল’ বলা হয়। যেমন, এক কেজি উন্নতমানের খেজুরের সাথে দুই কেজি নিম্নমানের খেজুর বিনিময় করা হলে নিম্নমানের খেজুরের ঐ অতিরিক্ত এক কেজিই হবে ‘রিবা ফদল’।
এক কেজিই হবে ‘রিবা ফদল’।
( عن عبادة بن الصامت عن النبي صلى الله عليه وسلم قال الذهب بالذهب مثلا بمثل والفضة بالفضة مثلا يمثل والنمر بالتمر مثلا بمثل والبر بالبر مثلا يمثل والملح بالملح مثلا بمثل والشعير بالشعير مثلا يمثل فمن زاد أو ازداد فقد أربي بيعوا الذهب بالفضة كيف شئتم يدا بيد وبيعوا البر بالتمر كيف شئتم يدا بيد وبيعوا الشعير بالتمر كيف شئتم يدا بيد). (رواه الترمذي )
উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত। তিনি নবী থেকে বর্ণনা করেন, নবী বলেছেন, “স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান সমান হতে হবে। রৌপ্যের বিনিম্নয়ে রৌপ্য সমান সমান হতে হবে। খেজুরের বিনিময়ে খেজুর সমান সমান হতে হবে। গমের বিনিময়ে গম সমান সমান হতে হবে। লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান হতে হবে; যবের বিনিময়ে যব সমান সমান হতে হবে। এগুলোর লেনদেনে যে ব্যক্তি বেশি দিল এবং বেশি গ্রহণ করল সে সুদে লিপ্ত হলো। রূপার বিনিময়ে স্বর্ণ তোমরা যেভাবে ইচ্ছা নগদে বিক্রি করতে পার। খেজুরের বিনিময়ে গম যেভাবে ইচ্ছা নগদে বিক্রি করতে পার। খেজুরের বিনিময়ে যব যেভাবে ইচ্ছা নগদে বিক্রি করতে পার। (তিরমিযী)
عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه قال جاء بلال على النبي صلى الله عليه وسلم بتمر برني فقال له النبي صلى الله عليه وسلم من اين هذا قال بلال كان عندنا ثمر ردى قبعت منه صاعين بصاع لنطعم النبي صلى الله عليه وسلم فقال النبي صلى الله عليه وسلم عند ذلك اوه اوه عين الربا عين الربا لا تفعل ولكن اذا اردت ان تشتري فبع التمر ببيع آخر ثم اشتره. (رواه البخاری)
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিলাল (রা.) নবী (সা.) ঈটে-এর নিকট উন্নতমানের কিছু খেজুর নিয়ে এলেন। তখন নবী (সা.) তাঁকে বললেন, “এগুলো কোথেকে এনেছো? বিলাল (রা.) জবাবে বললেন, “আমাদের কিছু নিম্নমানের খেজুর ছিল, সেগুলোর দুই সা‘ দিয়ে এক সা’ ক্রয় করেছি। এটা নবী (সা.) কে খাওয়ানোর জন্য। তখন নবী (সা.) বললেন, ওহ। এটাই রিবা, এটাই রিবা, এটা করো না। যদি উন্নত মানের খেজুর ক্রয় করতে চাও, তাহলে তোমার কাছে যে খেজুর আছে তা প্রথমে বিক্রি করে দেবে অতঃপর প্রাপ্ত মূল্য দিয়ে উন্নতমানের খেজুর ক্রয় করবে। (বুখারী)
عن جابر (رض) قال لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم آكل الربا وموكله وكاتبه و شاهديه وقال هم سواء (رواه مسلم )
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের চুক্তিপত্রের লেখক ও সাক্ষী সকলের ওপর লা’নত দিয়েছেন এবং বলেছেন, তারা সকলে সমান অপরাধী।
(মুসলিম)
عن أبي هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الريا سبعون جوبا أيسرها أن
ينكح الرجل أمه (رواه ابن ماجه والبيهقي)
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, সুদের ৭০টি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের অপরাধের পরিমাণ হলো আপন মাকে বিয়ে করার ন্যায়। (ইবনে মাজাহ)
সম্পদ বরাদ্দে সুদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া:
সুদ ভিত্তিক ঋণের একটি স্থায়ী প্রবণতা হচ্ছে যে, তা সর্বদাই সাধারণ মানুষের স্বার্থের মোকাবিলায়, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ প্রধানত তারাই পায় যারা বিত্তশালী। সৌদী আরব মনিটরি এজেন্সির সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. এম, ওমর চাপরা সুদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সংক্ষেপে নিম্নোক্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন। সুদ ব্যাংক ব্যবস্থায় পুঁজি বণ্টনে বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বৃহৎ ও সর্বাধিক নগদ অর্থের অধিকারী কোম্পানীকে অর্থ যোগান দেয় অপেক্ষাকৃত কম সুদের হারে। যদিও জনগণের বৃহত্তর অংশের বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠীর জমাকৃত অর্থই ব্যাংকের আমানতের প্রধান উৎস, তবু এ অর্থের সুবিধা প্রধানত বিত্তশালীরাই ভোগ করে। জাস্টিজ তার্কী উসমানী বলেন-১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্টেট ব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে যে, ১৯৯৮ সালে ২,১৮৪,৪১৭ জন জমাকারীর মধ্যে মাত্র ৯২৬৭জন জমাকারী সর্বমোট ৪৩৮.৬৭ বিলিয়ন রুপী ব্যবহার করেছে যা ব্যাংকসমূহ থেকে প্রদত্ত ঋণের ৬৪.৫ শতাংশ।
উৎপাদনের উপর সুদের বিরূপ প্রভাব:
সূদী ব্যবস্থায় শক্তিশালীকে সহায়ক জামানতের ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করা হয় এবং ঋণের উদ্দেশ্য বা ব্যবহারকে ঋণ বরাদ্দের প্রধান বিবেচ্য বিষয় বা মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। সুদী ব্যবস্থায় সুদ দিতে পারলেই ঋণ পাওয়া যায়, এ কারণে এ ব্যবস্থায় উৎপাদন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ঋণ গ্রহণ করাও সম্ভব হয়।
আয় বণ্টনের উপর সুদের বিরূপ প্রভাব:
সুদ যেহেতু নির্ধারিত তাই সুদের ভিত্তিতে অর্থায়ন করা হলে সে কারবারে যদি লোকসান হয় তাহলে তা ঋণগ্রহীতার জন্য চরম যুলুমের কারণ হয়ে দাঁড়ায়; অপরদিকে কারবারে যদি খুব বেশী মুনাফা হয়, সে অবস্থায়ও ঋণদাতা বে-ইনসাফীর শিকার হয়। সুদী ব্যবস্থায় এ উভয়বিধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশংকা সমভাবেই বিদ্যমান। এ ব্যাপারে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যে, সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ছোট ছোট বহু ব্যবসায়ী সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে এটা লক্ষ্য করা যায় যে, উদ্যোক্তাগণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার নেয় তার তুলনায় তাদের নিজস্ব বিনিয়োগের পরিমাণ হয় খুবই নগণ্য। উদ্যোক্তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ যদি হয় ১০.০০ মিলিয়ন তাহলে তারা ব্যাংক থেকে ধার করে ৯০.০০ মিলিয়ন এবং তা বিপুল লাভজনক কারবারে খাটায়। এর অর্থ হচ্ছে, প্রকল্পের ৯০% ভাগ গড়ে তোলা হয়েছে আমানতকারীদের অর্থের দ্বারা; আর অবশিষ্ট মাত্র ১০% ভাগ অর্থ যোগান দেয়া হয়েছে নিজেদের পুঁজি দ্বারা। এ প্রকল্পে যদি বিপুল পরিমাণ মুনাফা হয়, তাহলে এর অতি নগণ্য অংশ আমানতকারীদের হাতে পৌঁছবে (সুদ হিসেবে বিভিন্ন দেশে) যার হার স্বাভাবিকভাবে ২% থেকে ১০% পর্যন্ত হয়ে থাকে; অথচ এ প্রকল্পে আমানতকারীদের সম্পদের অংশ হচ্ছে শতকরা ৯০% ভাগ। আর বাকী সাকুল্য মুনাফা নিয়ে যায় বড় বড় উদ্যোক্তারা, যদিও প্রকল্পে তাদের নিজস্ব প্রকৃত আমানতের পরিমাণ শতকরা ১০% ভাগের অধিক নয়। বিষয়টি এখানেই শেষ হয় না; বরং জমাকারী সাধারণ মানুষদের সুদ আকারে যে সামান। অংশ প্রদান করা হয়, উদ্যোক্তাগণ সেটুকুও ফিরিয়ে এনে নিজেদের পকেটে তোলে। কারণ ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেয়ার বিনিময়ে উদ্যোক্তারা ব্যাংককে যে সুদ দেয় উৎপাদন খরচ হিসেবে তা পণ্যের দামের সাথে যুক্ত হয় এবং পণ্যের বর্ধিত মূল্য আকারে জমাকারীদের প্রাপ্তসুদ আবার উদ্যোক্তাদের কাছেই ফিরে আসে।
কৃত্রিম মুদ্রা সম্প্রসারণ ও মুদ্রাস্ফীতি:
আধুনিক ব্যাংকের সুপরিজ্ঞাত একটি বৈশিষ্ট। আছে যাকে সাধারণত ‘অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। ব্যাংকের এ ক্ষমতা মুদ্রাস্ফীতিকে ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। ব্যাংকের ‘অর্থ সৃষ্টির’ এ ক্ষমতা কখন কোথা থেকে এলো সে ইতিহাস জানতে হলে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের স্বর্ণকার বা গোল্ডস্মিথদের কাহিনীতে যেতে হবে। সেকালে ইংল্যান্ডের লোকেরা তাদের স্বর্ণমুদ্রা গোল্ডস্মিথদের কাছে আমানত রাখত; আর স্বর্ণকার জমাকারীদের এ মর্মে রসিদ প্রদান করত। কালক্রমে এই রসিদই স্বর্ণমুদ্রার স্থান দখল করে নেয় এবং লোকেরা এই রসিদের দ্বারাই তাদের দায়দেনা পরিশোধ করতে আরম্ভ করে। এ রসিদ ক্রমে বাজারে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করল। দেখা গেল যে, স্বর্ণ জমাকারী বা বাহক রসিদধারীদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশই কেবল তাদের জমাকৃত সোনা তুলে নেয়ার জন্য স্বর্ণকারদের কাছে আসে। এ অবস্থা লক্ষ্য করে স্বর্ণকারগণ তাদের কাছে গচ্ছিত স্বর্ণের কিছু অংশ গোপনে ধার দিতো এবং এভাবে ধার দিয়ে সুদ অর্জন করতে লাগল। কিছুকাল পর স্বর্ণকারগণ আবিষ্কার করল যে, তারা তাদের কাছে জমাকৃত অর্থের চেয়ে বেশী পরিমাণ অর্থ (অর্থাৎ স্বর্ণ গচ্ছিত থাকার কাগুজে সার্টিফিকেট) ছাপিয়ে নিতে পারে এবং এ অতিরিক্ত অর্থ (কাগুজে রসিদ) সুদে ধার দিতে পারে। তারা তাই করল। আর এটাই হচ্ছে অর্থ সৃষ্টি বা আংশিক রিজার্ভ ভিত্তিক ঋণের গোড়ার কথা। ক্রমান্বয়ে তাদের কাছে গচ্ছিত প্রকৃত স্বর্ণের চার, পাঁচ, এমনকি দশ গুণ পর্যন্ত স্বর্ণ জমার সার্টিফিকেট ধার দেয়া শুরু করল। ফলে মুদ্রাস্ফীতি প্রকটরূপ ধারণ করতে থাকে।
সুদের বিপরীতে ইসলাম হালাল কারবারের বিভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে যা উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। সুদের অভিশাপে আজ পৃথিবীর মানুষ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে ইসলামী অর্থব্যবস্থার দিকে ফিরে আসতে উরু করেছে। ফলে মুসলিম বিশ্বের বাইরে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাপুরও ইসলামী অর্থশাস্ত্র চর্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
(লেখক। গবেষণা কর্মকর্তা, সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস্ অব বাংলাদেশ।




