মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমা‘ঈল সালাফী রহ. : জীবন ও কর্ম

তানযীল আহমাদ

পূর্বকথা : পাক-ভারত উপমহাদেশের যে কয়েকজন ‘আলিমে দ্বীন নিজের মেধা, শ্রম, বুদ্ধিকে প্রবাহ করেছেন তাওহীদ ও সুন্নাহর ঝাণ্ডা উঁচু করার জন্য, যারা একাধারে দার্স-তাদরীস, তা’লিম, তানযীম ও তাসনীফের কাজে সফলতার উচ্চস্তরে আরোহণ করেছেন কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টা প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে, মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) তাদের অগ্রজ হিসাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠাকে আলোকিত করেছেন। যারা দেশ, সমাজ ও ধর্মের কাছে সমাদৃত হয়েছেন সমভাবে তিনি তাদের উদাহরণ হিসাবেই উদিত হয়েছেন ও হবেন কালান্তরে। যারা সত্য ও ন্যয়ের কথা বলতে গিয়ে জালিমের কারাপ্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হয়েও পাহাড়সম অবিচল ছিলেন, উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সম্পদ যুবশ্রেণির হৃদয়পটে ভাষ্কর হয়ে রয়েছেন, তিনি তাদের অন্যতম। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষই আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি।

সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)’র দাদা ও পিতা : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমা‘ঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)’র দাদাজান ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক-হাকিম ‘আব্দুল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ)। তার ছিল চার পুত্র। যথা-

১. মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম,
২. মাওলানা আহমাদ,
৩. মাওলানা ‘আবদুল আযীয,
৪. মাওলানা মুহাম্মাদ আলম।

মাওলানা মুহাম্মাদ ইব্রাহীমই সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)’র গর্বিত পিতা। বংশীয় পেশা কিতাব লেখা, (সে যুগে ফটোকপি বা টাইপের প্রচলন না থাকায় বিভিন্ন কিতাব একাধিক কপি করা হত হাতেই, এটা একটা পেশায় পরিণত হয়েছিল) ও চিকিৎসাই ছিল মাওলানা মুহাম্মাদ ইব্রাহীমের জীবিকা নির্বাহের উপায়। আর তিনি এই কাজে সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

মাওলানা আব্দুল মান্নান উযীরাবাদী (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন তৎকালীন সেই অঞ্চলের বিখ্যাত আহলে হাদীস ‘আলিম। মিয়া নাযির হুসাইন দেহলভির উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের একজন হলেন মাওলানা আব্দুল মান্নান উযিরাবাদী। তার দারসে প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসত দারস্ গ্রহণের জন্য। মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম চিকিৎসার পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনের জন্য সেই দারসে হাজির হতেন। এভাবে তিনিও কুরআন-সুন্নাহয় বেশ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। সুতরাং চিকিৎসা, কিতাব কপি করা ও দ্বীনী ‘ইলমের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীমের মাঝে।

ইবরাহীম সাহেব ছিলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। আর তার উস্তায মাওলানা আব্দুল মান্নান উযীরাবাদী ছিলেন আহলে হাদীস সুপ্রসিদ্ধ আলিম। শিক্ষকের নিকটে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান লাভ করার পর তিনি ম্বীয় মাযহাব ত্যাগ করে আহলে হাদীস মাসলাকে দীক্ষিত হন।

জন্ম : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) ১৩১৪ হিজরী মুতাবেক ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে উযীরাবাদ (পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য জেলা। লাহোর থেকে ১০০ কি. মি. উত্তরে চেনাব নদীর তীরে অবস্থিত। ) জেলার গুজরানওয়ালায় জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা গ্রহণ : সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) বাল্যজীবনে তার পিতার নিকট থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। সেইসাথে মাওলানা ‘উমার উদ্দীন উযীরাবাদীর নিকটে নাহু, সরফ, গুলিস্তা, বুস্তা প্রভৃতি কিতাবে জ্ঞান লাভ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি তার পিতার উস্তায মাওলানা আব্দুল মান্নান উযীরাবাদীর নিকট গমন করে দ্বীনি শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় সফলতার সাথে বিচরণ করেন।

দিল্লী গমন : তৎকালীন ভারতবর্ষের ইসলামী শিক্ষাগার ও ‘ইলমের লালনকেন্দ্র হিসাবে দিল্লির বেশ সুনাম-সুখ্যাতি ছিল। ভারত বিখ্যাত উলামায়ে কিরামের পদচারণায় মুখরিত ছিল দিল্লী। তিনি মাওলানা আব্দুল মান্নান উযীরাবাদীর নিকট শিক্ষা লাভ করে মাত্র ১২/১৩ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে দিল্লী গমন করেন। শাইখুল আরব ওয়াল আজম মুহাদ্দিস আল্লামা নাযীর হুসাইন দেহলভী (রহিমাহুল্লাহ) (১২২০ হি./১৮০২ খ্রি.-১৩২০ হি./১৯০২ খ্রি.)  যে মাদ্রাসায় র্দাস প্রদান করতেন সেখানে এসে তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল জব্বার উমরপুরীসহ অন্যান্য বড় বড় ‘আলিমের নিকট ইসলামের বিভিন্ন শাখায় বুৎপত্তি অর্জন করেন।

অমৃতসর সফর : বর্তমান ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত অমৃতসর তৎকালীন সময়ে বিখ্যাত আহলে হাদীস পরিবার “গজনবী পরিবারের” ‘ইল্মী খিদমাত দ্বারা সিক্ত ছিল। যেখানে যুগশ্রেষ্ঠ মুনাজির, জমঈয়তে আহলে হাদীস হিন্দের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আবুল ওয়াফা সানাউল্লাহ অমৃতসরী (১২৮৫ হি.-১৩৬৭ হি.) জন্ম গ্রহণ করেন। সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) সেখানে এসে গজনবী পরিবারের শ্রেষ্ঠ দুই সন্তান মাওলানা আব্দুল গফুর গজনবী ও মাওলানা আ. রহীম গজনবীর নিকট ‘ইল্ম অর্জন করেন। অতঃপর বিভিন্ন বিষয়ে যেমন- ‘ইল্মে মানতেক, ‘ইল্মে কালাম, ‘ইল্মে ফালসাফাহ, ‘ইল্মে নাফস ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন মুফতী মুহাম্মাদ হাসানের নিকট। যিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভের পর লাহোরে জামিয়া আশরাফিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।

যাদের দ্বারা তিনি প্রভাবিত : মানুষ কারো না কারো প্রতি দুর্বল হয়। কারো না কারো দ্বারা সে প্রভাবিত হয়। সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যতিক্রম নন। ‘ইল্মী ময়দানে তিনি প্রভাবিত ছিলেন অমৃতসরের মুফতী মুহাম্মাদ হাসান-এর। অপরদিকে সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি প্রভাবিত ছিলেন আল্লামা সানাউল্লাহ অমৃতসরী দ্বারা। আবার রাজনৈতিকভাবে তিনি প্রভাবিত ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, কংগ্রেস সভাপতি, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আযাদের (১৩০৬ হি./১৮৮৮ খ্রি.-১৩৭৭ হি./১৯৫৮ খ্রি.) দ্বারা। এভাবেই রাজনীতি, জমঈয়তে আহলে হাদীস ও ‘ইল্মী ময়দানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হয়েছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমা‘ঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)। যার ফলে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য।

শিয়ালকোট আগমন : অতীতকাল থেকেই শিয়ালকোট ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল। যেখানে মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক আল্লামা ড. মুহাম্মাদ ইকবাল (রহিমাহুল্লাহ) (১৮৭৭ হি.-১৯৩৮ খ্রি.) জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) শিয়ালকোটে এসে সেখানকার বিখ্যাত আহলে হাদীস ‘আলিম মাওলানা ইব্রাহীম মীর শিয়ালকোটীর (১২৯১ হি./১৮৭১ খ্রি.-১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.) নিকট শিক্ষার্জন করেন। যেহেতু নিজের নামের সাথে ছাত্রের পিতার নামের মিল রয়েছে এজন্য মাওলানা ইব্রাহীম মীর শিয়ালকোটী সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-কে খুব ভালোবাসতেন। এমনকি তার বিশাল লাইব্রেরীর বিভিন্ন অমূল্য কিতাবাদী তাকে দান করেছিলেন।

হাদীস বর্ণনায় ইজাযত লাভ : হাদীস বর্ণনার জন্য ইজাযত লাভ অন্যতম শর্ত। সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) দু’জন মহান ব্যক্তি থেকে সেই ইজাযত লাভ করেন।

এক. মাওলানা আব্দুল মান্নান উযীরাবাদী; যিনি উস্তাযে পাঞ্জাব উপাধীতে ভূষিত ছিলেন

দুই. মক্কার বিখ্যাত সালাফী ‘আলিম শায়খ আবূ বক্র খুকীর (রহিমাহুল্লাহ)। এভাবে দেখা যায় সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) ও নাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাঝে নিরবিচ্ছিন্ন সনদে ২৪ জন রাবী রয়েছেন।

গুজরানওয়ালায় প্রত্যাবর্তন : সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) নিজ জন্মভূমি গুজরানওয়ালায় মাওলানা ইব্রাহীম মীর শিয়ালকোটীর সাথে ১৩৩৯ হিজরী মুতাবিক ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্যাবর্তন করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কর্মচঞ্চল এই মহান মনীষী নিজ জন্মভূমিতে আগমন করলে সকলেই সাদরে বরণ করে নেন। মাওলানা ইব্রাহীম মীর শিয়ালকোটী বলেন, আমি এখানে বেশিদিন থাকব না আর আমি এখানকার স্থানীয়ও নই। সুতরাং তুমিই এর দেখাশোনা করো। সেই সময়ে গুজরানওয়ালায় হাতেগোনা কয়েকজন জমঈয়ত হিতৈষী ছিলেন। এরপর সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) গুজরানওয়ালাতেই নিজের কর্মক্ষেত্র স্থির করলেন। সেখানকার আহলে হাদীসের কেন্দ্রীয় মাসজিদে ইমামতি ও খুতবার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দীকাল ব্যাপী ছিল তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন।

এরই মধ্যে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফকীহ আল্লামা বিন বায (রহিমাহুল্লাহ) সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-কে মাদীনায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করেন। কিন্তু তিনি গুজরানওয়ালাতেই অবস্থান করাকে প্রাধান্য দেন এবং তদস্থলে শায়খ হাফিয মুহাম্মাদ কান্দলভীকে প্রেরণ করেন।

গুজরানওয়ালার এই আহলে হাদীস মাসজিদেই তিনি নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন মাদ্রাসা মুহাম্মাদীয়া। যেটি পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে পাঞ্জাবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পিপাসা নিবারণ করত। সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) এই মাদ্রাসায় শুধু পাঠদানেই ক্ষান্ত ছিলেন না; বরং বিভিন্ন স্থান থেকে যোগ্য শিক্ষকদেরকে নিয়োগ দিয়ে এই মাদ্রাসাকে একটি আদর্শ ও উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসায় পরিণত করেছিলেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো-সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)’র ইন্তিকালের পর গুজরানওয়ালা জমঈয়তে আহলে হাদীস মাদ্রাসা রক্ষণাবেক্ষণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)।

ছাত্রবৃন্দ : মাদ্রাসা মুহাম্মাদীয়া থেকে এমন সহস্রাধিক ছাত্র বের হয়েছেন যারা পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে তাওহীদ ও সুন্নাহর বাণী প্রচারে অমরত্ব লাভ করেছেন। তাদের উল্লেখযোগ্য হলো-

১. ইসলামী দর্শনের বিখ্যাত পণ্ডিত শায়খ মুহাম্মাদ হানীফ নদভী।
২. শায়খ তায়্যিব ‘আব্দুল্লাহ নাসর।
৩. শায়খ হাফিয মুহাম্মাদ ইসমা‘ঈল যাবীহ, যিনি বক্তৃতা ও পাঠদানে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
৪. শায়খ মুঈনুদ্দীন লাক্ষ্মৌভী, যিনি ‘ইল্মে সিয়াসাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।
৫. শায়খ মুহাম্মাদ সুলাইমান কাইলানী, যিনি আরবী ও ফারসী ভাষার কিতাবাদী অনুবাদে সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
৬. শায়খ খালেদ কারজাখী, যিনি “ইদারাতু ইহয়ায়ে সুন্নাহ” প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়াও অসংখ্য ছাত্র রয়েছেন যারা সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-এর হাতে শিক্ষা গ্রহণ করে আজীবন তাওহীদ ও সুন্নাহর খিদমাত করে গেছেন।

দৈনন্দিনের রুটিন : সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) জীবনে এত বেশি কর্মতৎপর ছিলেন যে, তা আমাদের বুঝতে খুবই কষ্টকর হয়। কিভাবে তিনি এত কাজের আঞ্জাম দিয়েছেন? মাসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত ইমামতি, জুমু‘আর খুতবাহ্ প্রদান, নিয়মিত দারসে কুরআন প্রদান, মাদ্রাসায় নিয়মিত দারস প্রদান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ফাতাওয়ার লিখিত জবাবসহ ক্ষুরধার লেখনী। জমঈয়তের তাবলীগী ও সাংগঠনিক সফর, স্বাধীনতা আন্দোলনে অনবদ্য অবদান, এই হলো তার জীবনের দৈনন্দিন রুটিন। কোথাও নেই একটু ফুরসত, সামান্য বিশ্রাম, বিরামহীন কর্মময় এই জীবনে তিনি জমঈয়তের যে খিদমাতে আঞ্জাম দিয়ে গেছেন তা কি আমরা স্মরণ করি? তাদের রেখে যাওয়া পবিত্র আমানত কি আমরা যথাযথভাবে রক্ষা করি না-কি আমাদের দ্বারা খিয়ানত হচ্ছে?

বক্তৃতার মাঠে : বক্তৃতার ময়দানেও সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার বক্তৃতা ছিল তথ্য ও যুক্তিনির্ভর, বাস্তবভিত্তিক। বাক্য চয়নে ফুটে উঠত তার সাহিত্যের লালিত্য, শব্দের উচ্চাঙ্গতা তাকে দিয়েছিল আকর্ষণীয় এক অদৃশ্য শক্তি। বক্তব্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা, বিষয়বস্তুতে শ্রোতামণ্ডলীকে ডুবিয়ে ফেলা, আর মুষলধারে এত উচ্চসাহিত্যের শব্দের আগমন সত্যিই যেন কথামালার পূঁতির মতো। ১৯২১ সালের পর থেকে তিনি কখনো কোন বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে বক্তব্য দেননি। পাঞ্জাবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত সব শ্রেণির শ্রোতাই তার বক্তব্যে হতো বিমুগ্ধ, বিমোহিত ছিল তার ভক্ত ও অনুরক্ত।

লিখনী : এত ব্যস্ততার মাঝেও সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) উম্মাহর জন্য রেখে গেছেন অমূল্য কিছু গ্রন্থ, যা তাকে দান করেছে অমরত্ব। তিনি আরবী ভাষায় সুপণ্ডিত হওয়ার পরও লিখে গেছেন উর্দুতে। সেগুলোর বেশ কিছু প্রকাশিত, আর কিছু অপ্রকাশিত।

সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) লিখনি ও মৌলিক রচনাসমূহ

  1. إسلامى حكمومت كا مختصر خاكه
    (ইসলামী হুকুমতের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা)
  2. جماعت إسلامى كا نظري مى حديث
    (জামা‘আতে ইসলামীর দৃষ্টিতে হাদীস)
  3. تحرىكى أزادى فكر اور شاه ولى الله
    (স্বাধীনতা আন্দোলন: একটি চিন্তা ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর সংস্কার কার্যক্রম)
  4. مسئلہ حيات النبى
    (হায়াতুন নবী প্রসঙ্গ)
  5. مسئلہ زيارت قبور
    (কবর যিয়ারত প্রসঙ্গ)

আরবী ভাষায় অনূদিত গ্রন্থসমূহ

(অনুবাদক: প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক ড. মুকতাদা হাসান আল-আযহারী)

  1. حركة الانطلاق الفكري وجهود الشاه ولى الله في التجديد
    (মূল গ্রন্থ: تحرىكى أزادى فكر اور شاه ولى الله)
  2. رسالة في مسئلة حياة النبى
    (মূল গ্রন্থ: مسئلہ حيات النبى )
  3. مسئلة زيارات القبور فى ضؤء الكتاب والسنة
    (মূল গ্রন্থ: مسئلہ زيارت قبور)

অন্যান্য গ্রন্থ (আরবী ভাষায়)

  • السنة فى ضوء القرآن
  • مكانة السنة فى التشريع الإسلامى
  • صفة صلاة النبى
  • تخطيط وجيز للحكومة الإسلامية
  • مذهب الإمام البخارى

সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-এর লিখিত কিতাবগুলো ভারতের বিখ্যাত সংস্থা “ইদারাতুল বুহুস আল ইসলামিয়্যাহ ওয়াদ দা‘ওয়াহ ওয়াল ইফতা” প্রকাশ করেছে। সৌদী সরকারও তার বেশ কিছু কিতাব আরবীতে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছে। এভাবে আরব দুনিয়াতেও সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-এর গ্রন্থাদি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

জমঈয়তে আহলে হাদীস এবং সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) : জমঈয়তে আহলে হাদীস এবং মাওলানা সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য অংশ, ছিলেন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল ধরে নিরলস খিদমাত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন উপমহাদেশের প্রাচীন এই সংগঠনের। গুজরানওয়ালায় অবস্থান শুরু করলে ১৯৩১ সালে তিনি পাঞ্জাব জমঈয়তের স্থানীয় অফিসের পরিচালক পদে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৪০ সালে দিল্লী মহাসম্মেলনে জমঈয়তের শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদের সেক্রেটারী নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালে হিন্দুস্তান থেকে পাকিস্তান পৃথক হলে নতুন করে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান জমঈয়তে আহলে হাদীস পুনর্গঠিত হয়। নির্বাচনে আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ দাঊদ গজনবী (রহিমাহুল্লাহ) সভাপতি হিসাবে মনোনীত হন। আর মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবে নির্বাচিত হন।

আমৃত্যু তিনি এই পদে বহাল থেকে জমঈয়তের উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধনে অংশীদার হয়েছেন। তার এই পদের মেয়াদ ছিল (১৯৫২-১৯৬৮) ১৬ বছর।

ষাটের দশকে কাদিয়ানী ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে সারা ভারত-পাকিস্তানে ঐতিহাসিক খতমে নবুওয়াত আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে খতমে নাবুওয়াত আন্দোলনের মহাসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটিতে জমঈয়তে আহলে হাদীসের পক্ষ থেকে তিনজন মনোনীত হন। তাদের মাঝে শায়খ ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) অন্যতম। এই আন্দোলনে সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)-কে কারাবরণও করতে হয়েছিল। (সূত্র : ১৯৪৯ সালের ১৯ আগষ্টে প্রথম প্রকাশিত পাকিস্তান জমঈয়তের সাপ্তাহিক মূলপত্র “আল ই’তিসাম”। মার্চ, ১৯৬৮ সংখ্যা।)

১৯২৪ সালে ভারতে (বিশেষ করে মধ্য ভারতে) যখন জোর করে মুসলমানদের হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার অপপ্রয়াস চলছিল যা “শুদ্ধি আন্দোলন” নামে পরিচিত, তখন মধ্য প্রদেশে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মুসলিম নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। পাঞ্জাব প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি।

মুহাজিরদের খিদমতে সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) : দেশ ভাগের পর ভারতে বসবাসরত অনেক মুসলিম হিজরত করে পাকিস্তানে পাড়ি জমালেন। শরয়ী দৃষ্টিকোণে তারা মুহাজির হিসাবে গণ্য হলেন। নতুন দেশ পাকিস্তানে তাদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে এলো পাকিস্তান জমঈয়তে আহলে হাদীস। গুজরানওয়ালায় হিজরতকারী মুসলিমদের দেখাশুনার জন্য জমঈয়তের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পেলেন মাওলানা ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)। দিনরাত বিশ্রামহীন পরিশ্রম করে মুহাজিরদের সেবা করলেন তার মতো বিখ্যাত একজন ‘আলিম। স্মরণীয় হয়ে থাকলেন ইতিহাসের পাতায়। গর্বিত অংশীদার হলেন মুহাজিরদের সেবাদানে।

জামিয়া সালাফিয়া ফয়সালাবাদ প্রতিষ্ঠা : সালাফী (রহিমাহুল্লাহ) দিবানিশি স্বপ্ন দেখছিলেন একটি জামিয়া প্রতিষ্ঠার। যেখানে আহলে হাদীস মাসলাক ও সালাফদের মানহাজ পাবে প্রাধান্য। কুরআন-সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা উচ্চারিত হবে সেই দ্বীনি মারকায থেকে। এজন্য তার পছন্দ ছিল স্বাধীন কাশ্মীর অথবা পাকিস্তানের অন্য কোনো শহর। আল্লাহ তা‘আলা সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন। ৭ শাবান, ১৩৭৪ মুতাবিক এপ্রিল ১৯৫১। তিনি লায়েলপুরে (পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ফয়সালাবাদের পূর্ব নাম। ১৯৭৯ সালে সৌদী বাদশাহ শাহ ফয়সালের নামে ফয়সালাবাদ নামকরণ করা হয়।) প্রতিষ্ঠা করলেন জামে‘য়া সালাফিয়া। শুরু হলো পথচলা। অবিরাম, অবিচল, তাওহীদের দৃপ্ত শপথ নিয়ে। জামিয়া সালাফিয়ার লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির জন্য তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি শায়খ বিন বাযের সাথে পত্রালাপে যোগাযোগ করলেন। মদীনার শিক্ষকদেরকে আমন্ত্রণ করলেন জামি‘য়ার র্দাস প্রদানের জন্য। যোগাযোগ ফলপ্রসু হয়েছিল। বেশ কয়েকজন সৌদী শায়খ জামিয়া সালাফিয়ায় এসে শিক্ষকতাও করেছিলেন।

ইহধাম ত্যাগ : মানুষ মরণশীল। বিশ্ববিশ্রুত এই অলঙ্ঘনীয় নীতিবাক্য মানতে বাধ্য হলেন মাওলানা ইসমাঈল সালাফী (রহিমাহুল্লাহ)।

কয়েক বছর যাবৎ হাড়ের রোগে অসুস্থ থাকার পর ১৩৮৭ হিজরীর ২রা যিলকদ মুতাবেক ১৯৬৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার বাদ ‘আসর ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ, বিজ্ঞ আহলে হাদীস পণ্ডিত ইহকাল ত্যাগ করে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে পরপারে পাড়ি জমান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিঊন)।

প্রতিটি আহলে হাদীস সন্তান তার অপূর্ব ত্যাগ ও কুরবানীর কথা পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করুক এই প্রত্যাশাই করি।

Facebook

ড্যাশবোর্ড

পাঁচ দফা কর্মসূচি

তাওহীদ ও রিসালাতে মুহাম্মাদী সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন ও অনুশীলন।

ছাত্র ও যুব সমাজের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান।

ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।

যুব শক্তিকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানদান।

অনৈসলামিক রীতিনীতি প্রতিহত করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।

পছন্দের অপশনে ক্লিক করুন

আপনার সহযোগিতা জমা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ

একখনি করুন