পহেলা বৈশাখ : বাংলার সংস্কৃতির বিকৃতি

আব্দুল্লাহ বিন বেলাল হোসাইন

একটি জাতির সংস্কৃতি তার বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং ইতিহাসের প্রতিফলন। বাঙালির নববর্ষ উদযাপন ঐতিহাসিকভাবে একটি কৃষিভিত্তিক ও কর আদায়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (ফসলি সন) হিসেবে শুরু হলেও বর্তমানে এর সাথে এমন কিছু অনুষঙ্গ যুক্ত করা হয়েছে, যা মূল ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে আধুনিক উদযাপনে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো মূর্তিনির্ভর আচারের অনুপ্রবেশ এবং বল্গাহীন অপসংস্কৃতির চর্চা একে প্রকৃত বাঙালি ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, যে কোনো উৎসবের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তাওহীদ বা একত্ববাদ এবং শালীনতা। কিন্তু বর্তমান পহেলা বৈশাখের অনেক আচারে শির্ক (আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা) এবং বিজাতীয় বিশ্বাস প্রতিফলিত হচ্ছে, যা মুসলিম প্রধান এ দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্মীয় চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে তথাকথিত এ আধুনিক উদযাপন বাংলার শাশ্বত সংস্কৃতির বিকাশ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘সাংস্কৃতিক বিকৃতি’ হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে।

বাংলা সংস্কৃতির সূচনা : বাংলা সংস্কৃতির সূচনা কোনো একক সময় বা একক ঘটনার মাধ্যমে হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। প্রাচীনকাল থেকেই বর্তমান বাংলা অঞ্চলে নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, তিব্বত-বর্মী ও আর্যসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়ে এখানে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে ওঠে। নদীমাতৃক পরিবেশ, কৃষিনির্ভর জীবনযাপন এবং ঋতুচক্রভিত্তিক দৈনন্দিন অভ্যাসও এ সংস্কৃতির গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে প্রাচীন বাংলায় নগরসভ্যতার বিকাশ ঘটে এবং বাণিজ্য, কারুশিল্প ও সামাজিক সংগঠন শক্তিশালী হতে থাকে। এ ধারাবাহিকতায় ভাষার বিকাশ একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রাকৃত, অপভ্রংশ হয়ে ধীরে ধীরে বাংলা ভাষার জন্ম হয় এবং এ ভাষাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য, লোককথা, সংগীত, প্রবাদ-প্রবচন ও আচার-অনুষ্ঠানের একটি বিস্তৃত জগৎ তৈরি হয়, যা বাংলা সংস্কৃতিকে সুসংহত রূপ দেয়। পাল যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বাংলা অঞ্চলের শিক্ষা, স্থাপত্য ও চিন্তাধারায় বিশেষ ছাপ ফেলে এবং পরে সেন যুগে হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তবে বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ইসলামের আগমনের পর। মুসলিম শাসনামলে প্রশাসন, শিক্ষা, স্থাপত্য, সাহিত্য ও সামাজিক জীবনে নতুন ধারা সূচিত হয় এবং সুফি সাধকদের মাধ্যমে গ্রামবাংলায় ন্যায়, সাম্য, মানবতা ও ধর্মীয় নৈতিকতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে। এর ফলে বাংলা সংস্কৃতি আরো সমন্বিত ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে।

গ্রামীণ সমাজের জীবনধারা বাংলা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ছিল। কৃষিকাজ, নদীপথে যাতায়াত, মৌসুমি উৎসব, পারিবারিক ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং লোকজ ঐতিহ্যের ধারাবাহিক চর্চা বাংলার মানুষের সামাজিক পরিচয়কে সুদৃঢ় করে। এভাবে বহু শতাব্দীর সামাজিক, ভাষাগত, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক প্রভাবের সম্মিলনে ধীরে ধীরে বাংলা সংস্কৃতির সূচনা ও বিকাশ সম্পন্ন হয়েছে।

ইসলাম ও বাংলা সংস্কৃতির তফাৎ : ইসলাম একটি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা-যার ভিত্তি আল্লাহপ্রদত্ত ওহী, কুরআন ও সুন্নাহ। পক্ষান্তরে বাংলা সংস্কৃতি একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিবর্তনের ফল, যা বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতি, ভাষা, ধর্মীয় প্রভাব ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে। তাই ইসলাম ও বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে-উৎস, লক্ষ্য, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের দিক থেকে। এই পার্থক্য বোঝা একজন সচেতন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের উৎস মানবনির্মিত নয়; বরং তা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে-

﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا﴾

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণা করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

এ আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ইসলামের বিধান কোনো জাতিগত বা আঞ্চলিক সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা সার্বজনীন ও চিরন্তন। অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বহু ঐতিহাসিক ধাপ অতিক্রম করে। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গঠন প্রাচীন স্থানীয় জনজাতি, আর্য সংস্কৃতি, বৌদ্ধ ধর্ম এবং পরবর্তীকালে ইসলামের প্রভাবের সম্মিলিত ধারায় বিকশিত হয়েছে (পৃষ্ঠা : ৫৫-১২০)। এতে বোঝা যায়, বাংলা সংস্কৃতি একটি পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক বাস্তবতা, কিন্তু ইসলাম একটি অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধান।

ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন সাধন করা। আল্লাহ বলেন-

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴾

“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।”
এ ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মুসলিমের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ইবাদত ও তাকওয়া। পক্ষান্তরে বাংলা সংস্কৃতির লক্ষ্য মূলত সামাজিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, লোকজ রীতি বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের বিকাশ। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, বাংলার সংস্কৃতি নদীনির্ভর কৃষিজীবন, মৌসুমি উৎসব এবং গ্রামীণ সামাজিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে (পৃষ্ঠা : ১-৩০)। এতে বোঝা যায় বাংলা সংস্কৃতির ভিত্তি ধর্মীয় ওহী নয়; বরং সামাজিক অভিজ্ঞতা।

ইসলামে উৎসবের ধারণাও নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করেছেন,
“আল্লাহ তোমাদের জন্য ঐ দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুই দিন নির্ধারণ করেছেন; ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।”
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিমের উৎসব নির্ধারিত এবং তা ওহীভিত্তিক। অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতিতে বিভিন্ন মৌসুমি ও সামাজিক উৎসব রয়েছে, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে কৃষিনির্ভর জীবন ও লোকজ ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত। সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ আহমদ শরীফ তাঁর বাঙালীর সংস্কৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, বাংলার উৎসবসমূহ মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজ ও ঋতুচক্রের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত (পৃষ্ঠা : ৭৮-৯৫)। ফলে উৎসবের উৎস ও উদ্দেশ্যের দিক থেকেও ইসলাম ও বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট।

ইসলাম মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে ঈমান ও তাকওয়াকে গুরুত্ব দেয়। কুরআনে বলা হয়েছে-

﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ﴾

“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান।”
এ আয়াত মানবসমাজে মর্যাদার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাষাভিত্তিক ও আঞ্চলিক পরিচয়। ভাষা ও ভৌগোলিক অবস্থান একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখলেও ইসলামে তা মর্যাদার মানদণ্ড নয়; বরং ঈমানই প্রধান পরিচয়।

ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিক সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে- পোশাক, সামাজিক সম্পর্ক, বিনোদন, অর্থনীতি ও পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রেও। কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে-

”قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ“

“মুমিন পুরুষদের বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে।”
এ নির্দেশ ইসলামি সামাজিক শালীনতার ভিত্তি স্থাপন করে। অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতির কিছু অংশে সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় এমন উপাদান যুক্ত হয়েছে যা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সমাজচিন্তক কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর শাশ্বত বাংলা গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, বাংলা সংস্কৃতি বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রভাবের কারণে বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল রূপ ধারণ করেছে (পৃষ্ঠা : ২১-৪৫)। ফলে এটি স্থির ও একরৈখিক নয়।

অতএব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, ঐশী ও সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা-যার উদ্দেশ্য মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতি একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিবর্তনের ফল- যেখানে ভাষা, পরিবেশ, লোকজ ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রভাবের সম্মিলন রয়েছে। তাই একজন মুসলিমের জন্য প্রয়োজন-সংস্কৃতির যে অংশ ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা গ্রহণ করা এবং যে অংশ ইসলামি আদর্শের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তা পরিহার করা। এ ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামের নির্দেশিত মধ্যপন্থা।

হাজার বছরের সংস্কৃতি বলার বিকৃতি : বাংলার আধুনিক বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের সূচনা ঘটে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে, যেখানে প্রশাসনিক সুবিধার কারণে নতুন পঞ্জিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়। হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষিকাজের সঙ্গে খাজনা আদায়ে অসুবিধা দেখা দেয়। ফসলের মৌসুমের সাথে খাজনার মিল না থাকায় কৃষকরা প্রায়শই অসময়ে খাজনা দিতে বাধ্য হতেন। সম্রাট আকবর এ সমস্যার সমাধান করতে সৌরবর্ষ ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের পঞ্জিকা প্রণয়নের আদেশ দেন, যা বাস্তবায়ন করেন তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ (মতান্তরে ১১ মার্চ) থেকে এ বাংলা সনের কার্যক্রম শুরু হয়, যদিও আকবরের সিংহাসন আরোহণের দিন ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে হিসাব করা হয়। প্রথমে এ সনকে “ফসলি সন” বলা হতো, পরে এটি “বঙ্গাব্দ” বা “বাংলাবর্ষ” নামে পরিচিত হয়।

পহেলা বৈশাখের উদযাপনও মূলত এ প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে শুরু হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধের পরে, নতুন বছরে মানুষকে মিষ্টান্ন বিতরণ ও সামাজিক মিলনের মাধ্যমে উৎসব পালন করা হত। এসময় দোকানি ও ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলার মাধ্যমে হিসাব হালনাগাদ করতেন। এটি ছিল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান যা প্রশাসনিক প্রয়োজনে উদ্ভূত হলেও প্রাথমিকভাবে স্থানীয় সমাজে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।

নীহাররঞ্জন রায় তার গ্রন্থ বাঙালীর ইতিহাস (পৃষ্ঠা ৫৫-৬৫) উল্লেখ করেছেন, “বাংলা সনের আধুনিক রূপ আকবরের সময়ই শুরু হয়েছিল। পূর্বে নির্দিষ্ট পঞ্জিকা বা পহেলা বৈশাখের সামাজিক অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল না।” এছাড়াও রমেশচন্দ্র মজুমদার তার বাংলার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড (পৃষ্ঠা ২০-৩০) এ লিখেছেন, “পহেলা বৈশাখের নির্দিষ্ট তারিখ এবং প্রশাসনিক অনুষ্ঠান আকবরের সময়ের সৃষ্টি; পূর্বের ফসল উৎসবকে সরাসরি পহেলা বৈশাখ বলা যায় না।”

এ প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, পহেলা বৈশাখের আধুনিক রূপের ইতিহাস প্রায় ৪৫০-৪৬০ বছর, এটি হাজার বছরের পুরনো নয়। যদিও প্রাচীন বাংলায় কৃষিজীবনভিত্তিক ঋতুচক্র ও ফসল উৎসব দীর্ঘকাল ধরে চলে এসেছে, আধুনিক পহেলা বৈশাখ এবং বাংলা সনের প্রশাসনিক কাঠামো ১৬ শতকে প্রতিষ্ঠিত। তাই “পহেলা বৈশাখ হাজার বছরের ঐতিহ্য” দাবি ইতিহাসভিত্তিকভাবে ভুল এবং এটি মধ্যযুগীয় প্রশাসনিক সংস্কার এবং আধুনিক সামাজিক উদযাপনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে বিভ্রান্তভাবে মিশিয়ে বলা হয়েছে।

পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ : পহেলা বৈশাখ এখন যে রূপে উদযাপিত হয়, সেটি আর কেবল একটি “ঐতিহ্যবাহী উৎসব” নয়। এটি সংস্কৃতির আধিপত্যবাদ (পঁষঃঁৎধষ যবমবসড়হু)। যেখানে শক্তিশালী শ্রেণি, প্রশাসনিক ও শহুরে প্রতিষ্ঠান প্রাচীন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিকে নতুন আকারে নিয়ন্ত্রণ করছে। পহেলা বৈশাখের আধুনিক রূপ আমাদের বলে যে, ঐতিহ্য কখনোই স্থির থাকে না, বরং শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ফসল উৎসব বা হালখাতার মতো গ্রামীণ আচার মূলত সরাসরি কৃষিজীবন ও সামাজিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, কিন্তু আধুনিক বর্ষবরণের আচার এখন শহুরে সংগীত, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখোশ, শিল্পী‑সংগঠিত পারফরম্যান্স দ্বারা সংজ্ঞায়িত। অর্থাৎ, যেখানে এক সময় উৎসব ছিল লোকের নিজস্ব সৃষ্টি, সেখানে আজ তা শহুরে, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। মানুষ হিসেবে আমরা লক্ষ্য করি- যখন কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আচার শক্তিশালী শ্রেণি বা প্রশাসনের দ্বারা নতুন মানে ধারায় বাঁধা হয়, তখন প্রকৃত অর্থ ও ঐতিহ্য বিকৃত হয়। পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রে, শহুরে, মধ্যবিত্ত ও শিল্প-সংগঠনের আধিপত্য গ্রামের ঐতিহ্য, প্রাচীন মুসলিম নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রকৃত সামাজিক উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করেছে। ফলে এটি একধরনের সংস্কৃতি আধিপত্য হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন নির্দেশ দেয় যে, মানুষের জীবন ও উৎসব নৈতিক ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
রাসূল বলেছেন, “কোনো উৎসব আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া তৈরি করলে তা বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে”।

আধুনিক পহেলা বৈশাখের নগর কেন্দ্রিক, শিল্পী-নিয়ন্ত্রিত আচারগুলো মূল সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করে, যা স্পষ্টভাবে সংস্কৃতির আধিপত্যের চিহ্ন। সুতরাং, মানুষ হিসেবে আমরা বুঝতে পারি-যখন সংস্কৃতির আচার শক্তিশালী শ্রেণি বা শহুরে কেন্দ্রীয় প্রভাবের হাতে চলে যায়, তখন ঐতিহ্য তার প্রকৃত অর্থ হারায়। পহেলা বৈশাখ এটাই প্রমাণ করে: এটি এখন শহুরে ও আধুনিক সংস্কৃতির আধিপত্যবাদী আকারে রূপান্তরিত, যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে সংঘাত স্পষ্ট।

পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস : পহেলা বৈশাখের উদযাপন আধুনিক বাংলার সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি জটিল ও বিবর্তিত ঘটনা। এর শুরু মূলত বাংলা সনের প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত, যা মোঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী দ্বারা সৌরবর্ষ ও হিজরি সনের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ বাংলা সন কার্যকর হয় এবং হালখাতা খোলা ও নতুন হিসাব নথি প্রবর্তনের জন্য পহেলা বৈশাখ নির্ধারিত হয়। এটি ছিল মূলত একটি কৃষিজীবনভিত্তিক, সামাজিক ও নৈতিক অনুষ্ঠান, যেখানে ভূমি মালিক, ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ জনগণ একত্রিত হয়ে নতুন বছরের সূচনা উদযাপন করতেন।

ব্রিটিশ শাসনের সময় পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ উদযাপন ও সরকারি ছুটি হিসেবে আনুষ্ঠানিকীকরণ করা হয়, যা শহুরে প্রশাসনিক প্রভাবকে আরো দৃঢ় করে। তবে শহরের মানুষের দৈনন্দিন সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে মেলানোর জন্য মূল আচারগুলো-হালখাতা, মিষ্টান্ন বিতরণ, সামাজিক মিলন-ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। ১৯৬৭ সালে ঢাকার সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চালু করে। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে গ্রামীণ জীবন, লোকগীতি, নৃত্য ও মুখোশ ব্যবহৃত হতো। তবে এ শোভাযাত্রা তখনো বড় শহরের দর্শক-আকর্ষণের জন্য সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল না। ১৯৮৯ সালে এ শোভাযাত্রা নিয়মিত এবং শহুরে দর্শক-আকর্ষণমূলক আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে দেখা যায়, শহুরে শিল্পী, নাট্যনাটিকা, মুখোশ এবং অতিরিক্ত নাটকীয় পরিবেশের আধিপত্য, যা প্রাচীন গ্রামীণ ও নৈতিক উদ্দেশ্যকে গ্রাস করেছে। এ আধিপত্যকে একজন সমাজবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক অধিপত্য হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেখানে আধুনিক শহুরে শক্তি প্রাচীন সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্গঠন করছে।

পরিশেষে বলা যায়, উৎসবের নামে এমন কোনো আচার বা সংস্কৃতি লালন করা সমীচীন নয় যা একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও মৌলিক আদর্শের মূলে আঘাত করে। পহেলা বৈশাখের বর্তমান অনেক আয়োজনই বাঙালির প্রকৃত লোকজ ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং তা বিজাতীয় সংস্কৃতি ও আকিদাগত ভ্রান্তির এক সংমিশ্রণ। বিশেষ করে মুসলিম প্রধান এ জনপদে ‘মঙ্গল’ বা ‘কল্যাণ’ কামনার জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) বাদ দিয়ে বিভিন্ন মূর্তি বা প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রা করা স্পষ্টত ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে আমাদের এমন সংস্কৃতি চর্চা করা উচিত যা শালীনতা, একত্ববাদ এবং নিজস্ব স্বকীয়তাকে সমুন্নত রাখে। বিকৃত ও আমদানিকৃত অপসংস্কৃতির মোহ ত্যাগ করে তাওহীদি চেতনা এবং সত্য ঐতিহ্যের পথে ফিরে আসাই হবে সময়ের দাবি। তবেই একটি জাতি তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কেননা, বাংলাদেশের মানুষের চেতনাই হচ্ছে ইসলাম।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, বাংলা একাডেমি, (পৃষ্ঠা : ৪২)
সূরা আল-মায়েদা আয়াত : ৩।
সূরা আয-যারিয়াত আয়াত : ৫৬।
সুনান আবু দাউদ হা : ১১৩৪।
সূরা আল-হুজুরাত আয়াত : ১৩।
সূরা আন-নূর আয়াত : ৩০।
সূরা আল-হুজরাত আয়াত : ১৩।
সহীহ বুখারী, হা : ৫৭৬১।
সূত্র : নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস, পৃঃ ৫৫-৬৫; রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ২০-৩০

Facebook

ড্যাশবোর্ড

পাঁচ দফা কর্মসূচি

তাওহীদ ও রিসালাতে মুহাম্মাদী সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন ও অনুশীলন।

ছাত্র ও যুব সমাজের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান।

ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।

যুব শক্তিকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানদান।

অনৈসলামিক রীতিনীতি প্রতিহত করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।

পছন্দের অপশনে ক্লিক করুন

আপনার সহযোগিতা জমা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ

একখনি করুন