পৃথিবীর ইতিহাস যুদ্ধের ইতিহাস। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যুদ্ধের কালো দাগ রয়েছে। প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয়েছে যুদ্ধ দিয়ে, শেষও হয়েছে যুদ্ধের কারণে। বড় বড় সভ্যতা টিকে ছিল যুদ্ধ করেই। নিছক জ্ঞানের চর্চা করে কোনো জাতি কখনোই পৃথিবীতে কর্তৃত্ব করতে পারে নি। জ্ঞানীরা যোদ্ধাদের সেবা দিয়ে গেছে মাত্র। এখনো যাচ্ছে। জ্ঞানার্জন সাহসিকতার প্রথম পরিচয়; যেহেতু জ্ঞানার্জনে আত্মপরিচয় লাভ করা যায়, নিজেকে চেনা যায়। ফলে মনে সাহস সঞ্চার হয়, ভয় কম হয়। সকিন্তু যুদ্ধ হলো সাহসিকতার শেষ পরিচয়, নিজেকে জানার ও জানানোর এক বিস্তৃত ময়দান, সাহস ও বুদ্ধির উর্বর ক্ষেত্র। কাজেই তা ভীতুদের কাজ নয়, সাহসীদের কাজ। জীবন মানেই যুদ্ধ। যুদ্ধই জীবন। যে জীবনে যুদ্ধ নেই, সংগ্রাম নেই, বিপ্লব নেই, সে জীবনে জয়ের পরমানন্দ নেই, সফলতার সার্থকতা নেই, বিজয়ের হাসি নেই। যুদ্ধহীন যে জীবন সে জীবন পরাজিত, ভীতু, অথর্ব। যুদ্ধ না করেই সে জীবন পরাভূত। মরার আগেই সে জীবন মৃত, মূল্যহীন। যার মাথা নেই তার আবার মাথা ব্যাথা কিসের, যার পুত্র নেই পুত্র হারানোর শোকের কাতরতা সে কিভাবে বুঝবে, যে জীবনে কান্নার বেদনা নেই সে জীবনে হাসির কোনো মুল্য নেই, যার প্রেয়সী নেই সে কিরুপে মজনু হতে পারে? ওসব মজনুর ভান ধরে ধোঁকা দেয়া ও আত্মপ্রতারণা ছাড়া আর কিছু না।
জ্ঞানীরা যোদ্ধা নয়, যোদ্ধারাই জ্ঞানী। যুদ্ধা ছাড়া, যোদ্ধা ছাড়া জ্ঞানের কোনোই মূল্য নেই। বাগদাদে জ্ঞান ও জ্ঞানীদের অভাব ছিল না, অভাব ছিল যোদ্ধাদের। ফলে তাতাররা যা করার তা তো করলোই, যা কেউ কোনোদিন কল্পনাই করে নি তাও তারা করল। যুদ্ধাস্ত্রই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, ক্ষমতার কলকাঠি, শক্তির মাপকাঠি, জনগণের পূজনীয় বস্তু। ক্যালডেনীয় সভ্যতা, মেসোপটেমিয় সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, পারসিক সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, ইসলামি সভ্যতা-সব সভ্যতার বৃহদাংশ জুড়ে রয়েছে যুদ্ধ। হ্যাঁ, অন্যান্য সভ্যতার যুদ্ধের সাথে ইসলামি সভ্যতার যুদ্ধের বিশাল ফারাক আছে। শুধু সাম্রাজ্য বিস্তার যেখানে অন্যান্য সভ্যতার মূল লক্ষ্য, ইসলাম সেখানে নিছক সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেয় না। ইসলামের যুদ্ধ বা জেহাদ হলো ন্যায়ের জন্য অন্যায়ের প্রতিবাদে, জুলুমের অবসানকল্পে ইনসাফের প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষকে মানুষের গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর গোলামে পরিণত করতে, জাহিলিয়াতের অমানিশা বিদূরিত করে ইসলামের সোনালি রবির উদয় ঘটাতে, কুসংস্কারের স্তুপ থেকে উদ্ধার করে সংস্কারপন্থী ও প্রগতিশীল মানবজাতি বিনির্মাণকল্পে। যেমনটি কাদেসিয়ার যুদ্ধে পারসিক সেনাপতি রুস্তমের প্রশ্নের উত্তরে রিবয়ি বিন আমের রা: বলেছিলেন, “আমরা মানবজাতিকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর গোলামে পরিণত করতে, দুনিয়ার সংকীর্ণ জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করা পরকালের অনন্ত জীবনের অভিযাত্রী মানবগোষ্ঠী গঠন করতে এবং অজ্ঞতার অন্ধকার কূপ থেকে উদ্ধার করে ইসলামের ওহির আলোয় আলোকিত করতে সুদূর মরুভূমির ভবঘুরে জীবনাবসান ঘটিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েছি।”
মুসলিমরা রোম বিজয় করেছে যুদ্ধের মাধ্যমে, পারস্য বিজয় করেছে যুদ্ধের মাধ্যমে, স্পেন, ভারত, মধ্য এশিয়া, প্রাচ্য, প্রতীচ্য সহ যে সকল অঞ্চলে তারা শাসন করেছে সব ছিল যুদ্ধের মাধ্যমে। বাংলা বিজয় হয়েছিল যুদ্ধের মাধ্যমেই। ইখতিয়ার তার তেজী ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খেতে আসেননি, যুদ্ধ করতে এসেছিলেন। লক্ষণ সেন পিছনের খিড়কি দিয়ে এমনি পলায়ন করেনি, ভয়ে পলায়ন করেছিল। বিন কাসেম দেবলে ভিজিটর হিসেবে আসেননি, জিহাদ করতে, প্রতিশোধ নিতে এসেছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ স্পেন গিয়েছিলেন লি ই’লায়ি কালিমাতিল্লাহর নিশান উড্ডীন করতে, সরকারি খরচে আনন্দ ভ্রমনে নয়। সইরাক বিজেতা মহাবীর আবু উবাইদা বিন জাররাহ ও মুসান্না, সিরিয়া বিজেতা মহাবাহু খালিদ বিন ওয়ালিদ, মিসর বিজয়ী আমর বিন আস, মধ্য এশিয়া বিজয়ী কুতায়বা বিন মুসলিম, আল কুদসের পুনরুদ্ধারকারী গাযী সালাহউদ্দিন আইয়ুবীসহ ইসলামের গর্বিত সন্তানদেরকে ও তাদের অবদানকে কেন আমরা আলোচনার বিষয়বস্তু বানাচ্ছি না? কেন আমাদের আলোচনা শুধু ফযীলত আর আসমানী আকিদাহ (আল্লাহ কেন্দ্রীক আকিদাহ) দিয়ে ভরপুর? যমিনেরও তো আকিদাহ থাকতে পারে? এমনটি নয় তো যে, এসব আলোচনার মাধ্যমে মুসলিমদেরকে জিহাদ থেকে গাফেল করে রাখা হচ্ছে? যেমনটি সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর আমলে খ্রিস্টান পাদ্রীরা মুসলিম সেজে মসজিদে মসজিদে শুধু ফযীলতের আর জিহাদ বিমুখ আলোচনা করে জনগণকে জিহাদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন? এই সত্য ইতিহাসকে তো আর মানহাজের কথা বলে অস্বীকার করতে পারবেন না। মক্কা বিজয় হয়েছিল বিনা যুদ্ধে। কিন্তু সেটা বিজয়। যুদ্ধ হয় নি কারণ কুফফার শক্তি সাহস পায় নি।
যুদ্ধই পৃথিবীর রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, অর্থনৈতিক মুক্তি কিংবা বঞ্চনা-তাও নির্ধারণ করেছে যুদ্ধ। নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ- তও হয়েছে অস্ত্রের মুখে। অর্থনৈতিক বলয়-সেটাও হয়েছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধই দায়ি। বিভিন্ন শহরের পতন কিংবা উত্থান-সেটাও যুদ্ধের জন্য। “নদীর একূল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে এইতো নদীর খেলাসকাল বেলার বাদশাহ রে তুই ফকীর সন্ধা বেলা” গানটির বাস্তবতাও যুদ্ধ। যুদ্ধই যুদ্ধকে টেনে এনেছে, যুদ্ধই আবার শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধই বাস্তবতা, আবশ্যিক ও অবশ্যম্ভাবী; “যুদ্ধ নয় শান্তি চাই” ডাহা মিথ্যা কথা, মুখের বুলি, কল্পনাবিলাস ও ধোঁকা। মিনাওয়া সভ্যতা, আসিরিয় সভ্যতা, হিট্টাইট সভ্যতা, ফিনিশিয় সভ্যতাসহ যত সভ্যতা ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলীন হয়েছে সবগুলোর পেছনে রয়েছে যুদ্ধের ভূমিকা। যুদ্ধ ছাড়া কোনো জাতি আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে নি। আজকের আধুনিক সভ্যতার!!! দাবিদার আমেরিকাও টিকে আছে ঐ এক যুদ্ধ আর যুদ্ধাস্ত্র দিয়েই।
বদরের যুদ্ধের মাধ্যমেই ইসলাম ও কুফরী শক্তির প্রকাশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়; এজন্যই এ যুদ্ধকে পবিত্র কুরআনে “আল ইয়াওমুল ফুরকান” বা সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী দিবস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাদেসিয়ার যুদ্ধের মাধ্যমেই মূলত পারসিক সভ্যতার পতন হয়। মুতার যুদ্ধের মাধ্যমে সেই যে রোমান খ্রিস্টানদের পতনযাত্রা শুরু হয়েছিল তা মুহাম্মাদ আল ফাতিহ এর হাতে এসে চূড়ান্তভাবে শেষ হয়। মুহাম্মাদ বিন কাসিম মূর্তিপূজারি ও লুটেরার দেশ ভারতে সেই যে অভিযান শুরু করেছিলেন তা মুহাম্মাদ ঘুরি ও সুলতান মাহমুদ গজনবীর হাত ধরে সর্বশেষে জহিরুদ্দিন মুহাম্মাদ বাবরের হাতে ভারতে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করে। পলাশী না হলে এই উপমহাদেশে হয়তো ইংরেজ রাজত্বের সূর্যোদয় হতো না। বালাকোট, রেশমী রুমাল আন্দোলন, জিহাদ আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, বাঁশের কেল্লা, সিপাহী বিপ্লব ও অসহযোগ আন্দোলন না হলে এতদিনেও হয়তো উপমহাদেশে ইংরেজ মুল্লুকের ডাকাতি শাসনের সূর্যাস্ত হতো না। একাত্তর না হলে বাংলাদেশও হতো না।
সুতরাং যুদ্ধই এই পৃথিবীর শেষ কথা। এটা আমার আবেগ নয়, বাস্তবতা। পৃথিবীর বাস্তবতা, ইতিহাসের বাস্তবতা। যোদ্ধারাই পুরুষ, সুপুরুষ, সাহসী পুরুষ। বাকীরা সব ভীতু, জগতের কলংক, কাপুরুষ।
ভূস্বর্গ কাশ্মীরে আজ যে শকুনের শ্যেন দৃষ্টি পড়েছে, কাশ্মীরে যে গনহত্যার অশনি সংকেত মুসলিম বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলতে শুরু করেছে, এর একমাত্র প্রতিকার খুনকা বদলা খুন, রক্তের বদলে রক্ত। ওসব জাতিসংঘ পাতিসংঘ দিয়ে যে কোনো কাজ হবে না তা মুসলমানদের বুঝা শেষ। অস্ত্রই পারে এর শেষ সমাধান করতে। পার্লামেন্টে ইমরান খানের এই কথাটি আমার বেশ ভালো লেগেছে (জানি না কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিবেন কিনা), “আমাদের সামনে দুইটি পথ, এক. বাহাদুর শাহ জাফরের পথ, দুই. টিপু সুলতানের পথ। বাহাদুর শাহের পথ ভীতুদের জন্য, যুদ্ধ না করেই পরাজিতদের জন্য। পক্ষান্তরে টিপু সুলতানের পথ সাহসীদের জন্য, লড়াকুদের জন্য, বীরদের জন্য। আমরা সেই পথেই হাটবো।”
কাশ্মীরকে, পাকিস্তানকে একই পথ অবলম্বন করতে হবে। মুসলিমরা থাকবে মুসলিমদের পাশে, হিন্দুস্তানের দালালরা হিন্দুদের পাশে।




