ভূমিকা : ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা বিশ্বের মযলুম শ্রমিকরা এদিনে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, প্রতিবাদ সভা ও র্যালি বের করাসহ নানান কর্মসূচি পালন করে থাকে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাজনৈতিক নেতারাও সে সকল সভা-সমিতিতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে অশিক্ষিত শ্রমিকদের করতালির আশায় তাদের পক্ষে গলা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে, হস্তদ্বয়ের বিভিন্ন প্রকার ভঙ্গিমাসহ তেজস্বী বক্তৃতামালা পেশ করে থাকেন। তাদের সে সকল বক্তৃতার চুম্বুকাংশ নোট করে আমাদের অতি আপনজন সাংবাদিক ভাইয়েরা খবরের কাগজে ছাপানোর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। পরেরদিন প্রভাতে খবরের কাগজে এসব অগ্নিঝরা বক্তব্য পাঠ করেই মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ সার্বিক সুযোগ-সুবিধার নানাবিধ আশ্বাসের বাণী তুলনামূলক কোমল কন্ঠে উচ্চারণ করেন। সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও অর্থ বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো জ্ঞান না থাকায় শ্রমিকদল তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি শ্রম দিতে শুরু করেন। দিবসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে শ্রমিক যখন তার বেতন-ভাতা বৃদ্ধির স্বপ্নে বিভোর থাকে তখন তাদের কষ্টার্জিত পয়সা দিয়ে মালিকপক্ষ নাইট ক্লাবে ফূর্তি করে। একদিকে ঝড়ো বৃষ্টির রাতে শ্রমিকের থাকার জায়গা হয় না, অন্যদিকে মালিকপক্ষের শ্বেতপাথরের সুরম্য অট্টালিকা আকাশ ছুঁতে থেমে থাকে না। একদিকে দরিদ্র শ্রমিকের অসহায় মা-বাবা চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়, অন্যদিকে বড়লোক মালিক তার শরীরের চেক আপের জন্য প্রতি মাসে মাউন্ট এলিজাবেথ যায়। যখন অর্থাভাবে শ্রমিকের ছেলে-মেয়ের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন মালিকের ছেলে-মেয়ে পড়াশুনার জন্য আমেরিকা-ইউরোপে পাড়ি জমায়। একদিকে শ্রমিক তার মৃত মা বাবার দাফন কাফনের খরচের জন্য হিমশিম খায়, অন্যদিকে মালিক তার মৃত মা বাবার জন্য কুলখানি করতে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে।
আমাদের সমাজ জীবনে এমনই উন্নতির জোয়ার বইছে। তৈলাক্ত মস্তকে তৈল মর্দনের যে সামাজিক চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত অবলোকন করে চলছি তা কতদূর পর্যন্ত গড়াবে সেটাই আজকে চিন্তার বিষয়।
প্রেক্ষাপট : ১৮৯০ সাল থেকে ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এর আগে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগোতে ‘হে মার্কেটে’র সামনে দৈনিক আট ঘন্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। সরকারের গুণ্ডাবাহীনির গুলিতে সে দিন ১০/১১ জন শ্রমিক নিহত হয়। পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।
পুঁজিবাদের অভিশাপ : মূলতঃ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো। এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution)-এর ইতিহাসে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দিতে সমুদ্র যাত্রা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে গীর্জার পোপ ও ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের মাঝে শুরু হয় আদর্শিক সংঘর্ষ। একপর্যায়ে গীর্জার অনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে সেকুলারিজম সেখানে প্রভুত্ব করতে থাকে। পর্যায়ক্রমে অন্ধকার ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সংঘঠিত হয়। কৃষি ব্যবস্থা থেকে শিল্পায়নের দিকে ঝুঁকে যায় ইউরোপ। যে ভূমিতে একমসয় সবুজ শষ্যাদি আবাদ হতো, সেখানে এখন বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। ধ্বংস হয় কুটির শিল্প। শিল্পপতিরা তাদের সমস্ত অর্থ ইনভেষ্ট করতে থাকে সেসব কারখানায়। কৃষকদের আবাদি জমিন কেড়ে নেয়া হয়, কুটির শিল্পের মালিকরা সর্বস্বহারা হয়ে পড়ে। ফলে জীবিকার তাগিদে তারা শহরমুখী ও কারাখানায় কাজ করার জন্য ভীড় জমাতে শুরু করে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সমাজের বুর্জেয়া শ্রেণি। নামমাত্র বেতনে শ্রমিকদের গাধার মতো খাটায় তারা। আর করবেই না কেন? সমাজের এ সকল বুর্জোয়া শ্রেণির বিশ্বাস তাদের অকুন্ঠ সমর্থক ম্যানডেভিলের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে-
“গরীবদের থেকে কাজ নেয়ার একটিই মাত্র পথ, আর তাহলো এদেরকে গরীব থাকতে দাও, এদেরকে পরনির্ভরশীল করে তোলো। এদের প্রয়োজন খুব অল্প করেই পূরণ করা দরকার। আপন প্রয়োজন পূরণে এদেরকে সাবলস্বী করা চরম বোকামী।”
পুঁজিবাদের প্রখ্যাত প্রবক্তা টাউনসেন্ড উক্ত ঘৃণ্য মনোভাবটি আরো সোচ্চার করতে যেয়ে বলেন,
শ্রমিকদের এমন করুণ দশা ও স্বল্প বেতনের অভিযোগে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বুর্জোয়া শ্রেণির দ্বন্দ শুরু হয়। কিন্তু কথায় বলে, ‘টাকায় বাঘের চোখও মেলে’। রাজনৈতিক নেতাদের মুখ বন্ধ করার জন্য বুর্জোয়া মালিকপক্ষের কেউ কেউ রাজনীতিতে যোগদান করে আবার তাদের পকেট ভর্তি করার মাধ্যমে তাদরেকে খুশিও রাখে। এভাবে শিল্পপতিদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ফলে স্বভাবতই শ্রমিকদের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ে। শিল্পায়ন ও রাজনীতির হাত ধরে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয় পুঁজিবাদ। মেহনতি মানুষের রক্তে গড়ে ওঠে শিল্পপতিদের অট্টালিকা। অবস্থা এত বেগতিক হয় যে, কোনো পণ্য বেশি উৎপাদন হলে তা ধ্বংস করা হতো, যেন বাজারে তার সহজলভ্যতা না হয়। যেহেতু বাজারে কোনো পণ্যের সহজলভ্যতা হলে মুনাফাখোরিরা তাদের ইচ্ছামত সেটার অতিমূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন না। এজন্য একবার ব্রাজিলে প্রচুর পরিমাণে গম উৎপন্ন হলো। সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। কিন্তু বুর্জোয়ারা পড়ে গেল চিন্তায়। কারণ এত ফসল বাজারে উঠলে তাদের মজুতদারি করেও কোনো কাজ হবে না। তারা সিদ্ধান্ত নিলো এগুলোকে কিভাবে নষ্ট করা যায়? এত ফসল মাটিতে পুঁতে ফেলাও সম্ভব না আবার সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়াও যাবে না। অবশেষে তারা উৎপাদিত ফসলকে পুড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো। দুই লাখ পাউন্ড জ্বালানি তেল ব্যবহার করে ব্রাজিলে উৎপাদিত ফসলকে তারা পুড়িয়ে ফেলল। অরেকবার খাদ্য সংকট তৈরির জন্য তারা লিভারপুরের ২০০ নৌকা ডুবিয়ে দেয়। (ইসলামে শ্রমিকের অধিকার- ৫ পৃ.।)
সোশালিজমের ব্যর্থ চেষ্টা : সাদা চামড়ার সাম্রাজ্যবাদীরা পুঁজিবাদ সৃষ্টি করে গোটা শ্রম বাজারকে পরোক্ষভাবে করায়ত্ত করে। শ্রমিকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। এদিকে রাশিয়ায় শ্রমিকের উপর নির্যাতন আরো বৃদ্ধি পায়। দৈনিক আঠারো ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাদের। যুবক ও শিশু শ্রমিকের মাঝে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। একজন মহিলা শ্রমিককে তার গর্ভাবস্থায়ও কাজ করতে হয়। ফলে মার্কসীজম সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মার্কসীজমের মূল কথা হলো, যার যার সাধ্য অনুযায়ী কাজ আদায় করে নিতে হবে আর তার প্রয়োজন মাফিক তাকে অর্থ যোগান দিতে হবে। প্রথম প্রথম এই মতটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। লাল চামড়ার রাশিয়ানরা এই সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে খুব গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে থাকে। রাশিয়ার শ্রমিকদের নিকটে কাল মার্কস হয়ে ওঠেন এক সংগ্রামী প্রতিক। পরবর্তীতে লেলিন সেই মতবাদকে আরো ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে। ফলে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র রাশিয়ার সর্বস্তরের জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শিষ্যরা কখনো একথা ভাবেনি যে, কাল মার্কসের এই অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের সাময়িক সমস্যার সমাধান হলেও তাদের চিরস্থায়ী কোনো সমাধান হবে না। শ্রমিকদের শুধু প্রয়োজন মিটলে তারা আজীবন বংশপরম্পরায় শ্রমিকই থেকে যাবে। তাদের মালিক হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। ফলে বুর্জোয়া শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির মাঝে যে সমস্যা তা বন্ধ হবে না। এজন্যই মনে হয় রাশিয়ায় ১৯৩৬ সালে পূর্বের আইন পরিবর্তন করে নতুন আইন পাশ করা হয়। নতুন আইনে বলা হয়, শ্রমিকের নিকট থেকে তার সাধ্যানুযায়ী কাজ আদায় করতে হবে এবং তার কাজের পরিধি ও গুণগত মান বিবেচনা করে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু রাশিয়ান আইন প্রণেতা সোশালিজমের বোদ্ধারা টের পেয়েছেন কিনা যে, তাদের এই আইনে পুঁজিবাদেরই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কার্যত, যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কাল মার্কস সংগ্রাম করেছেন এবং তার ভাবশিষ্য লেলিন জেল খেটেছেন সেই পুঁজিবাদের দিকেই তাদের অনুসারীরা মোড় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
যাই হোক, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য বিশ্বে পরপর দু’টি মতবাদ, তথা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ তর্জন-গর্জন করলেও আধুনিককালে তাদের মতবাদের অসারতা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। এজন্যই বোধ হয় এ যুগে এসেও শ্রমিকদেরকে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হয়। পাওনা মজুরির জন্য মালিকপক্ষের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়। বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে সরকারের পোষ্যবাহীনি নানা ধরনের উপঢৌকন প্রেরণ করে থাকে। ফলে আধুনিক বিশ্বের সকল সম্পদ মোট জনসংখ্যার দশ ভাগ লোকের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। অর্থাৎ- বিশ্বের সাতশ কোটি মানুষ মাত্র দশ ভাগ লোকের নিকটে জিম্মি।
আন্তর্জাতিক শ্রম নীতি মূলত বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কাজের উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। এই নীতিমালার প্রধান কারিগর হলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)।
নিচে আন্তর্জাতিক শ্রম নীতির প্রধান দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. মৌলিক শ্রম অধিকার (Fundamental Principles)
ILO ১৯৯৮ সালের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী চারটি প্রধান ক্ষেত্রকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে:
ক. সংগঠন করার স্বাধীনতা: শ্রমিকদের নিজস্ব ইউনিয়ন গঠন এবং দরকষাকষির (Collective Bargaining) অধিকার।
খ. জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ: কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা বা দণ্ডবিধির মাধ্যমে কাজ করানো বন্ধ করা।
গ. শিশুশ্রম নিরসন: শিশুদের বিপজ্জনক কাজ থেকে দূরে রাখা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
ঘ. বৈষম্য দূরীকরণ: নিয়োগ, বেতন এবং পেশার ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভেদে বৈষম্য না করা।
২. কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা (Occupational Safety and Health)
আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে কাজ করার অধিকার রয়েছে। কারখানায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।
৩. কাজের সময় ও মজুরি
মজুরি: প্রতিটি শ্রমিকের জন্য ‘ন্যূনতম মজুরি’ নিশ্চিত করা, যা দিয়ে তিনি তার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারেন।
কর্মঘণ্টা: সাধারণত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ না করানো এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক (Overtime) প্রদান।
৪. সামাজিক সুরক্ষা (Social Security)
শ্রমিকরা অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় আহত হলে বা অবসরে গেলে যাতে আর্থিক সংকটে না পড়েন, সে জন্য বিমা বা পেনশন সুবিধার কথা আন্তর্জাতিক শ্রমনীতিতে উল্লেখ আছে।
৫. ডেসেন্ট ওয়ার্ক ((Decent Work Agenda)
বর্তমান বিশ্বে ILO ‘ডেসেন্ট ওয়ার্ক’ বা ‘শোভন কাজ’ এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো এমন কর্মসংস্থান তৈরি করা যা:
উৎপাদনশীল, ন্যায্য আয় নিশ্চিত করে, কাজের জায়গায় নিরাপত্তা দেয়, পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে।
শিশুশ্রম:
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) পরিচালিত ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২’ থেকে। এটি ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই তথ্যগুলোই নীতি নির্ধারণের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিচে জরিপের প্রধান ফলাফলগুলোর একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. শিশু শ্রমিকের মোট সংখ্যা
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শ্রমের পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:
মোট শিশু জনসংখ্যা: প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লাখ।
শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত শিশু: ১৭ লাখ ৮০ হাজার (৪.৪%)।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু: ১০ লাখ ৭০ হাজার।
(বি.প্র: ২০১৩ সালের জরিপের তুলনায় শিশুশ্রমিক সংখ্যা কমলেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি রয়ে গেছে)।
২. খাতভিত্তিক বিভাজন (Sector-wise Distribution)
কোন খাতে কত শিশু কাজ করছে তার একটি শতাংশ নিচে দেওয়া হলো:
কৃষি খাত: ৩০.৫% (ফসল কাটা, মাছ ধরা, গবাদি পশু পালন)
শিল্প খাত: ১৯.১% (ম্যানুফ্যাকচারিং, ইটভাটা, ছোট কারখানা)
সেবা খাত: ৫০.৪% (দোকানপাট, গ্যারেজ, পরিবহন, গৃহকর্ম)।
৩. লিঙ্গভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক পার্থক্য
ছেলে বনাম মেয়ে: শ্রমের বাজারে ছেলেদের অংশগ্রহণ মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি। জরিপ অনুযায়ী, মোট শিশুশ্রমিকের প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার ছেলে এবং ৪ লাখ ৪০ হাজার মেয়ে। (তবে গৃহকর্মে নিয়োজিত মেয়ে শিশুদের সংখ্যা এই মূল ধারার জরিপে অনেক সময় সঠিকভাবে উঠে আসে না)।
পল্লী বনাম শহর: গ্রামাঞ্চলে কৃষি কাজের কারণে শিশুশ্রমের সংখ্যা বেশি (প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার), যেখানে শহরে এই সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার।
৪. শ্রমের সময় ও মজুরি
জরিপে শিশুদের কর্মঘণ্টা নিয়ে একটি নেতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে:
গড় কর্মঘণ্টা: শিশুশ্রমিকরা সপ্তাহে গড়ে ৪৩ থেকে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করে।
মজুরি: অধিকাংশ শিশুশ্রমিক মাসে ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে মজুরি পায়, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের চেয়ে অনেক কম। অনেকে কেবল খাবার বা নামমাত্র হাতখরচের বিনিময়ে কাজ করে (বিশেষ করে গৃহকর্মে)।
৫. ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ (Hazardous Work)
সরকার ৪৩টি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও জরিপ বলছে শিশুরা এখনও নিচের কাজগুলোতে বেশি জড়িত:
অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ (ওয়েল্ডিং ও মেকানিক)।
ইটভাটা ও নির্মাণ কাজ, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, কালো ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাজ।
৬. শিক্ষা ও শিশুশ্রমের সম্পর্ক
জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার হার:
শিশুশ্রমিকদের বড় একটি অংশ (প্রায় ৪০% এর বেশি) কখনও স্কুলে যায়নি অথবা প্রাথমিক শেষ করার আগেই ঝরে পড়েছে।
অনেক শিশু দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে যায় এবং বাকি অর্ধেক সময় কাজ করে, যা তাদের পড়াশোনার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জরিপ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ (২০২৬ প্রেক্ষাপট):
২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের যে লক্ষ্য ছিল, তা পুরোপুরি অর্জিত না হওয়ার পেছনে কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুতিকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে ‘জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ কাউন্সিল’ এই জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা পর্যায়ে শিশুশ্রম নিরসন কমিটি গঠন করে কাজ করছে।
বাংলাদেশে নারী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও নারী শ্রমিকদের অধিকার এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়।
নিচে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের অধিকার ও বর্তমান বাস্তবতার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. আইনি অধিকার বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশের শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬ অনুযায়ী নারীদের বেশ কিছু বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন সব সময় ঘটে না।
মাতৃত্বকালীন ছুটি: আইনে ১২০ দিনের (প্রায় ৪ মাস) সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বা ছোট কারখানাগুলোতে অনেক সময় নারী শ্রমিকদের গর্ভাবস্থায় চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
সমান মজুরি: আইনে ‘একই কাজের জন্য সমান মজুরি’ নিশ্চিত করার কথা বলা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একই পজিশনে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকরা ১০-১৫% কম বেতন পাচ্ছেন।
রাতের শিফটে কাজ: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শ্রমিকের সম্মতি থাকলে নারীরা রাত ১০টার পরও কাজ করতে পারেন। তবে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকপক্ষের, যা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত থাকে।
২. কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও নিরাপত্তা
নারী শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মস্থলে মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা।
যৌন হয়রানি: হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ কারখানায় এটি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। মূলত নীতিবোধ না থাকলে কমিটি গঠন করে কোনো লাভ হবে না।
টয়লেট ও স্যানিটেশন: অনেক কারখানায় নারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা নেই। পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিরতি বা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ না থাকা নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৩. পেশাগত বৈষম্য (Glass Ceiling)
পোশাক শিল্পে ৮০% এর কাছাকাছি নারী কাজ করলেও সুপারভাইজার বা উচ্চতর ব্যবস্থাপক পদে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য।
নেতৃত্বের অভাব: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকায় তাদের বিশেষ সমস্যাগুলো (যেমন- ক্রেশ বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা) মালিকপক্ষের নজরে আসে না।
দক্ষতার উন্নয়ন: কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে নারীদের চেয়ে পুরুষদের বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
৪. গৃহকর্ম ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিক
বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন, যারা দীর্ঘদিন শ্রম আইনের আওতার বাইরে ছিলেন।
সুরক্ষার অভাব: গৃহকর্মীদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা সাপ্তাহিক ছুটি নেই। তারা প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, যা বন্ধ করার জন্য আইনি তদারকি এখনও অত্যন্ত দুর্বল।
অনলাইন ও ফ্রিল্যান্সিং: বর্তমান সময়ে নারীরা ই-কমার্স বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন, যেখানে কাজের নিশ্চয়তা বা সামাজিক সুরক্ষার অভাব একটি বড় সমস্যা।
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা : শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদার ব্যাপারে ইসলাম এমন কিছু সৌন্দর্যপূর্ণ মৌলিক নীতিমালা পেশ করেছে, যা বিশ্বের কোটি কোটি মযলুম মেহনতি শ্রমিকের সামনে আলোর দ্যুতি ছড়াবে। নিরাশার চাদরে ঢাকা খেটে খাওয়া নিপীড়িত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের সামনে আশার প্রদীপ হয়ে থাকবে। কিন্তু ইসলামের নাম শুনলেই একশ্রেণির লোকদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। ইসলামের সুনির্মল, স্বচ্ছ ও কালজয়ী আদর্শের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করাই তাদের কর্মসূচি। ফলে ইসলামের শ্রমব্যবস্থা ও অর্থব্যবস্থা বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী হলেও তা তাদের সহ্য হয়নি, হবেও না। বঞ্চিত মানুষের পক্ষে ইসলামের যে দরদমাখা অবস্থান তা যদি তারা মেনে নিত তাহলে কতই না ভালো হত! আমরা যদি ভারতে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে সাদা চোখেই দেখতে পাব, ইসলাম আগমনের প্রাক্কালেই এখানকার দলিত সম্প্রদায় ও নিম্নশ্রেণির দরিদ্ররাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। স্পেনে মুসলিমদেরকে শ্রমিকশ্রেণিই স্বাগত জানিয়েছিল। এমনকি মক্কায় ইসলামের সূচনালগ্নে দাস ও দরিদ্রশ্রেণিই তা গ্রহণ করেছিল। ইসলামে মানবাধিকারের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন সাহাবি জা‘ফার ইবনু আবূ তালিব (রা.) যখন আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী তাকে নবী মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন,
أَيُّهَا الْمَلِكُ، كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ، وَنَأْكُلُ الْمَيْتَةَ وَنَأْتِيْ الْفَوَاحِشَ، وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ، وَنُسِيءُ الْجِوَارَ يَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيْفَ، فَكُنَّا عَلٰى ذٰلِكَ حَتّٰى بَعَثَ اللهُ إِلَيْنَا رَسُوْلًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ، وَصِدْقَهُ، وَأَمَانَتَهُ، وَعَفَافَهُ، «فَدَعَانَا إِلَى اللهِ لِنُوَحِّدَهُ، وَنَعْبُدَهُ، وَنَخْلَعَ مَا كُنَّا نَعْبُدُ نَحْنُ وَآبَاؤُنَا مِنْ دُوْنِهِ مِنَ الحِجَارَةِ وَالْأَوْثَانِ، وَأَمَرَنَا بِصِدْقِ الْحَدِيْثِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ، وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَحُسْنِ الْجِوَارِ، وَالْكَفِّ عَنِ الْمَحَارِمِ، وَالدِّمَاءِ، وَنَهَانَا عَنِ الْفَوَاحِشِ، وَقَوْلِ الزُّوْرِ، وَأَكْلِ مَالَ الْيَتِيْمِ، وَقَذْفِ الْمُحْصَنَةِ.
“হে বাদশাহ! আমরা ছিলাম জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত জন্তু ভক্ষণ করতাম, অশ্লীল কর্মকাণ্ডে ডুবে ছিলাম ও প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করতাম। আর আমাদের শক্তিশালী লোকেরা দুর্বলদেরকে বঞ্চিত করে রাখত। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নিকটে আমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন- যার বংশ মর্যাদা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা এবং চারিত্রিক নিষ্কলুষতার ব্যাপারে আমরা সম্যক অবগত। তিনি আমাদেরকে মহান আল্লাহর ‘ইবাদত ও তাঁর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেন, আমাদের পিতৃ-পুরুষগণ যে গাছ পূজা ও পাথর পূজা করত তা থেকে আমাদেরকে মুক্ত হতে বলেন। তিনি আমাদেরকে আদেশ করেন সত্য বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করতে। তিনি নিষেধ করেছেন হারাম কাজে লিপ্ত হতে, রক্তপাত করতে, অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়তে, মিথ্যা বলতে, ইয়াতিমের সম্পদ অবৈধ পন্থায় গ্রাস করতে এবং সতী-সাধ্বী নারীকে মিথ্যা অপবাদ দিতে। (মুসনাদে আহমাদ- হা. ১৭৪০।)
এই হাদীস উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, সাহাবি জা‘ফার (রা.) একজন খ্রিষ্টান শাসকের নিকটে নবী (সা.)-এর পরিচয় তুলে ধরেছেন মানবতাবাদী হিসেবে। যিনি মানুষকে ভালো আচরণের কথা বলেন, আমানত রক্ষার সদুপদেশ দেন, সত্যের নির্দেশনা প্রদান করেন। সুতরাং তিনি তার অধিনস্তদের সাথে কিরূপ আচরণ করবেন তা সহজেই অনুমেয়। আসুন! আমরা জেনে নেই দুনিয়ার মযলুম মেহনতি মানুষের জন্য মানবতার নবী মুহাম্মাদ (সা.) কি বলেছেন-
০১. মালিক শ্রমিক ভাই ভাই : একদা আবূ যার (রা.) তার এক দাসকে ভর্ৎসনা করলে নবী (সা.) তাকে বলেন, হে আবূ যার! তুমি এমন একজন ব্যক্তি যার মাঝে এখনো জাহিলি স্বভাব বিদ্যমান। এরপর তিনি বলেন :
إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ فَضَّلَكُمُ اللهُ عَلَيْهِمْ.
‘নিশ্চয় তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপরে তোমাদের কর্তৃত্ব দিয়েছেন।’ (সুনান আবু দাঊদ- হা. ৫০৬৭, মা. শা., হা. ৫১৫৭, সহীহ।)
উল্লিখিত হাদীসে নবী (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন :
- দাস, শ্রমিক বা অধস্তন কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা জাহিলী স্বভাব।
- মালিক শ্রমিক পরস্পর ভাই ভাই।
০২. শ্রমিকের ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে : সাহাবী আনাস (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.)-এর দশ বছর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি যে, তুমি কেন এটি করলে আর কেন এটি করলে না!!! (সহীহুল বুখারী- হা. ২৭৬৮।)
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে- এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর নিকটে এসে বলল, আমার এক দাস রয়েছে। সে আমাকে বিরক্ত করে ও গালি দেয়। আমি কি তাকে প্রহার করতে পারব? নবী (সা.) বললেন,
تَعْفُوْ عَنْهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعِيْنَ مَرَّةًََََ.
‘তুমি প্রতিদিন তাকে সত্তর বার ক্ষমা করতে থাকো।’ (মুসনাদে অহমাদ- হা. ৫৬৩৫, সহীহ।)
০৩. মালিক শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান : ইসলামের সাম্যনীতি আসলেই অবাক করার মতো। সেই যুগে ক্রীতদাসের যে করুন অবস্থা বিরজিত ছিল সে কঠোরনীতির মূলে কুঠারাঘাত করে নবী (সা.) ঘোষণা করেন,
إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيْكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوْهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ.
‘তোমাদের ভাইয়েরা তোমাদের সেবক। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যার অধীনে কোনো সেবক রয়েছে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায়, তাকে যেন সেই মানের পোষাক পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে।’ (সহীহ বুখারী- হা. ৩০।)
ইসলামই মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম যেখানে শ্রমিকদের পক্ষে এমন সমতার কথা বলা হয়েছে।
০৪. শ্রমিকের নির্ধারিত বেতন ছাড়াও উৎপাদিত পণ্যের কিছু অংশ দেয়া : নবী (সা.) বলেন,
إِذَا جَاءَ خَادِمُ أَحَدِكُمْ بِطَعَامِهِ، فَلْيُقْعِدْهُ مَعَهُ، أَوْ لِيُنَاوِلْهُ مِنْهُ، فَإِنَّهُ هُوَ الَّذِيْ وَلِيَ حَرَّهُ وَدُخَانَهُ.
‘যখন তোমাদের খাদেম খাবার নিয়ে আসে তখন যেন সে তাকে তার সাথে বসায় অথবা তার হাতে খাবার তুলে দেয়। কেননা খাবার তৈরির যে তাপ ও ধোঁয়ার কষ্ট তা খাদেমকেই সহ্য করতে হয়েছে।’ (সুনান ইবনু মাজাহ্- হা. ৩২৯১।)
এখানে আমরা মাওলানা আব্দুর রহীম (রহ.)-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেন,
‘এই হাদীস হইতে প্রমাণিত হয় যে, শ্রমিক নিজের শ্রমের সাহায্যে মালিকের কাঁচামাল বা মূলধন খাটাইয়া যাহা উৎপন্ন করিবে, তাহা হইতে তাহাকে নির্দিষ্ট হারে বেতন দেওয়ার পরও আসল মুনাফা হইতে তাহাকে কিছু না কিছু অংশ দিতে হইবে। হাদীসে উল্লিখিত ঘরের বাবুর্চি আর কারখানার শ্রমিকের মধ্যে মূলতঃ কোনো পার্থক্য নেই। একজন বাবুর্চিকে খাদ্য পাকাইবার কাজে যেভাবে মনযোগ দিতে হয়, দেহ ও চিন্তা শক্তিকে যেভাবে নির্দিষ্ট এক কাজের জন্য নিয়োজিত করিতে হয়, কম-বেশি প্রায় তদ্রুপই কারখানার একজন মজুরকেও খাঁটিতে হয়। কাজেই এই হাদীস অনুসারে নির্বিশেষে সকল শ্রমিকই কারখানায় উৎপন্ন দ্রব্য হইতে অংশ পাইতে পারিবে। যে মিলে কাপড় তৈরি হয়, প্রত্যেক শ্রমিককে তাহার পরিবারবর্গের জন্য বৎসরে এক বা একাধিকবার কাপড় দেওয়া যাইতে পারে। ইহা নির্দিষ্ট বেতনের মধ্যে গণ্য হইবে না। কারণ প্রায়ই দেখা যায়, কোনো মিলে শ্রমিক সকাল-সন্ধা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়া থানকে থান কাপড় বুনে অথচ তাহার নিজের বা তাহার পরিবারের লোকদের পরিধানে হয়ত ছিন্নবস্ত্রটুকুরও অস্তিত্ব নেই। এই হাদীস অনুসারে ইসলামী সমাজে যে শ্রমনীতি কায়েম করা হইবে তাহাতে এই অবাঞ্চিত পরিস্থিতির অবকাশ থাকিতে পারিবে না।’ (ইসলামী সমাজে মজুরের অধিকার- ২৬ পৃ.।)
০৫. সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে না দেয়া : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا﴾
“আল্লাহ তা‘আলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না।” (সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৮৬।)
নবী (সা.) বলেন,
وَلَا يُكَلِّفُهُ مِنَ العَمَلِ مَا يَغْلِبُهُ، فَإِنْ كَلَّفَهُ مَا يَغْلِبُهُ فَلْيُعِنْهُ عَلَيْهِ.
‘তার সাধ্যশক্তির অতীত কোনো কাজের চাপ যেন তাকে না দেয়। দিলে সে কাজ সমাধা করার ব্যাপারে যেন তাকে যথাযথ সহযোগিতা করে।’ (সহীহুল বুখারী- হা. ২৪০৭।)
সহযোগিতার অর্থ এই নয় যে, আপনাকেই কারখানায় গিয়ে তাদের সাথে কাজ করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো, আপনি সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ দিবেন, ভালো মানের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করবেন, শ্রমিককে পর্যাপ্ত সময় দিবেন এমনকি তাদের দৈহিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য পুস্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করবেন।
উপসংহার : ইসলামের এই শ্রমনীতি যদি মালিকপক্ষ মেনে চলত তাহলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, কাল মার্কস, লেলিন অথবা মাও সে তুংয়ের ভুয়া কমিউনিজমের জন্য শ্রমিকশ্রেণি এত আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ বা ধর্মঘট করত না। তার ইসলামের ন্যায়ানুগ শ্রমনীতি মেনে নিয়ে আরামে জীবন-যাপন করতে পারত। কিন্তু কে শুনে কার কথা।
বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় অক্টোপাসের মতো মালিকপক্ষের অবস্থাদৃষ্টে অনেক আগে পড়া বাংলাদেশের প্রখ্যাত রম্য সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমাদের ফুড কনফারেন্সের গল্পটি মনে পড়ে গেল। গল্পটি মোটামুটি এমন…
সারাদেশে দুর্ভিক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষুধা আর রোগে মানুষ এবং পশুপাখির একাকার অবস্থা। রাজধানী ঢাকায় কাঙ্গালের দল ছুটে এসেছে দু’মুঠো ভাতের আশায়। ভুখা-নাঙ্গা মানুষের কারণে সমাজের সাহেবগণ রাস্তায় বেরও হতে পারছিলেন না। আগে যেখানে গাউন শাড়ি পরা মহিলারা হাঁটত এখন সেখানে অর্ধ উলঙ্গ ছেঁড়া কাপড়ে পল্লীর মা মেয়ের অবস্থান। বাবুরা যেখানে আগে প্রাত্যহিক ব্যায়ামের জন্য গমনাগমা করত এখন সেখানে ভিক্ষুকের দলের প্রচণ্ড ভীর। রাজধানীর পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে পরিবেশবাদীরাও থেমে নেই। এর একটা বিহিত করা চাই। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের মাথামুণ্ডু টাইপের ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে এলেন। সারাদেশে রিলিফের মাল বিতরণের জন্য সবাই একাট্টা হলেন। সে সভায় সভাপতিত্ব করলেন শেরে বাংলা। তার পাশে অন্যান্য আসন অলংকৃত করলেন বিল্লিয়ে বাংলা, কুত্তায়ে বাংলা, শিয়ালে বাংলা, ছাগলে বাংলা, গাধায়ে বাংলা, হাতিয়ে বাংলা, টাট্টুয়ে বাংলাসহ আরো অনেকে। একমাত্র মানুষে বাংলা সেই কনফারেন্সে অনুপস্থিত ছিল। ফলে কনফারেন্সের সর্বশেষ স্লোগান হলো- জানোয়ারে বাংলা জিন্দাবাদ, মানুষে বাংলা মুর্দাবাদ।
* শিক্ষক : মাদ্রাসা দারুস সুন্নাহ-মিরপুর; সাধারণ সম্পাদক, জমঈয়ত শুব্বানে আহলে হাদীস বাংলাদেশ।
- . ইসলামে শ্রমিকের অধিকার- ৫ পৃ.।
- . মুসনাদে আহমাদ- হা. ১৭৪০।
- . সুনান আবু দাঊদ- হা. ৫০৬৭, মা. শা., হা. ৫১৫৭, সহীহ।
- . সহীহুল বুখারী- হা. ২৭৬৮।
- . মুসনাদে অহমাদ- হা. ৫৬৩৫, সহীহ।
- . সহীহ বুখারী- হা. ৩০।
- . সুনান ইবনু মাজাহ্- হা. ৩২৯১।
- . ইসলামী সমাজে মজুরের অধিকার- ২৬ পৃ.।
- . সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৮৬।
- . সহীহুল বুখারী- হা. ২৪০৭।



